তিস্তায় তীব্র ঢল, ১১ জেলায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দী
Printed Edition
রংপুর ব্যুরো
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীতে তীব্র বন্যা দেখা দিয়েছে। ভারতের উজান অংশে গজলডোবা ব্যারাজের গেটগুলো খুলে দেয়ায় বাংলাদেশের লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট (গেট) একযোগে খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
এর ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত ২৩০ কিলোমিটার নদী অববাহিকার দুই তীরের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল হু হু করে প্লাবিত হচ্ছে। আকস্মিক এই বন্যায় (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) নদী তীরবর্তী অন্তত ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ভাঙন দেখা দিয়েছে অববাহিকার অন্তত ৩৬টি পয়েন্টে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, তিস্তায় চলতি মরশুমে এটি তৃতীয়বারের মতো পানি বৃদ্ধি। গত সোমবার বিকেল ৫টায় ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হলেও সন্ধ্যা থেকে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় বিপদসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার, সকাল ৯টায় ১০ সেন্টিমিটার এবং দুপুর ১২টায় ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে ঢলের তীব্রতা বেড়ে বেলা ৩টায় পানি বিপদসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, উজান ও ভাটিতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানির চাপ সামলাতে ব্যারেজের ৪৪টি গেটই খোলা রাখা হয়েছে।
হঠাৎ পানি বৃদ্ধিতে তিস্তার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের উঠতি বোরো ধান, চিনাবাদাম, মিষ্টিকুমড়া ও শাকসবজির ক্ষেত কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। লকলকিয়ে ওঠা পাট গাছ ও আমনের বীজতলাও পানির নিচে তলিয়ে থাকায় পচন ধরার আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। কালীগঞ্জের কাশীরাম এলাকার বাদাম চাষি লাকু মিয়া ও রংপুরের চর চব্বিশ হাজারী গ্রামের কৃষক আনোয়ারুল হক জানান, জমিতে পানি জমে থাকায় বাদাম গাছ হলুদ হয়ে যাচ্ছে এবং আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় নতুন করে লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।
নদীর ক্যাচমেন্ট এরিয়া ও চরাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় গবাদিপশু ও সন্তানদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা। মহিপুর চরের মকবুল হোসেন ও রাজপুরের ঝন্টু মিয়া জানান, গত দুদিন ধরে তারা পানিবন্দী অবস্থায় আছেন। রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী জানান, তার ইউনিয়নের শংকরদহ, ইচলি ও বাগেরহাট আশ্রয়ণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গ্রামে প্রায় এক হাজার পরিবার পানিবন্দী। কোলকন্দ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম ৭০০ পরিবার এবং নোহালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী তার এলাকায় হাজারেরও বেশি পরিবার পানিবন্দী হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। ডালিয়া, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, হাতীবান্ধা, মহিষখোচাসহ চার জেলার নদী তীরবর্তী কয়েক ডজন গ্রামে এখন শুধুই পানি আর পানি।
পানি ওঠানামার সাথে সাথে তিস্তা অববাহিকার অন্তত ৩৬টি স্থানে নদীভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে গঙ্গাচড়ার হরিপুর তিস্তা সড়ক সেতুর রক্ষা বাঁধে ভাঙন ধরেছে। ভেসে গেছে কোলকন্দ ইউনিয়নের বাম তীর রক্ষা বাঁধের গ্রোয়েন স্পারের দুই পাশের ফসলি জমি। এ ছাড়া গান্নারপার, ভোটমারী, বিদ্যানন্দ, বুড়িরহাট ও সুন্দরগঞ্জের বেলকাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন ঠেকাতে পাউবোকে চিঠি দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। অন্যদিকে, কুড়িগ্রামে ধরলা ও দুধকুমারসহ ১১টি নদ-নদীর পানি ওঠানামা করায় চরাঞ্চলে বন্যা ও ভাঙন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানান, বাঁধ ও লোকালয়ের ভাঙন ঠেকাতে পাউবোকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। রংপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘তিস্তার বন্যাটি যেহেতু ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’, তাই দ্রুত পানি নেমে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে নদীপাড়ে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আক্রান্তদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হবে এবং শুকনো খাবার সরবরাহ করা হবে।’
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট ও দুধকুমার অববাহিকার ডিসি ও ইউএনওরা সার্বক্ষণিক মাঠে আছেন। পানিবন্দী পরিবারের তালিকা তৈরির কাজ চলছে এবং তালিকা পেলেই দ্রুত সরকারি খাদ্য সহায়তা ও সব ধরনের ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হবে।