র্যাব কর্মকর্তার মৃত্যু
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী ধরতে প্রস্তুতি যথাযথ ছিল কি না প্রশ্ন উঠেছে
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য খ্যাত জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী ধরতে অভিযানে গিয়ে এক র্যাব কর্মকর্তা নিহতের পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। সেখানে সাঁড়াশি অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে যৌথবাহিনী এমন তথ্য মিলেছে। তবে সেখানকার সন্ত্রাসীদের পেছনে বৃহৎ রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষতা থাকায় অভিযান কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। একই সাথে গত সোমবারের সেই অভিযানের প্রস্তুতি যথাযথ ছিল কি না, সে প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে তথ্যগত বিভ্রান্তির মাধ্যমে র্যাব সদস্যদের ফাঁদে ফেলা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও সামনে আসছে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে সেখানে সন্ত্রাসীদের ধরতে প্রয়োজনে পুরো এলাকা কর্ডন করে হেলিকপ্টার দিয়েও অভিযান চালানো উচিত।
ইতঃপূর্বে অসংখ্যবার সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের ওপর সেখানে আক্রমণ হওয়া সত্ত্বেও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত সলিমপুরে এত দুর্বল প্রস্তুতি নিয়ে অস্ত্রধারীদের ধরতে অভিযান সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ অভিযানে যাওয়া বাহিনীর মধ্যেই সমন্বয় ছিল কি না, সে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আবার সন্ত্রাসীদের ভয়ঙ্কর উপস্থিতির কথা জানা সত্ত্বেও অভিযানের প্রাক্কালে কেন অন্যান্য বাহিনীর সহায়তা নেয়া হয়নি সে প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। ছিন্নমূল সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে গতকাল বুধবার সকালে সেখানে মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের আস্ফালনও দেখিয়েছে সন্ত্রাসীরা।
এ দিকে র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমান চট্টগ্রামে নিহত র্যাব কর্মকর্তার নামাজে জানাজায় এসে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘প্রায় ৫০ জনের ওপরে র্যাব সদস্য ছিলেন। অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করা যাবে, এ ধরনের একটা ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা সেখানে যান। এখন একটা তদন্ত কমিশন গঠন করেছি। তারা অনুসন্ধান করে দেখবে, অভিযানে কোনো ত্রুটি ছিল কি না।’
ইতঃপূর্বে চট্টগ্রামে চাকরি পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্যের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নিহত হওয়ার ঘটনা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এখন নিশ্চিতভাবেই সেখানে শক্ত অভিযান পরিচালনা করা হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, সন্ত্রাসীরা হয়তো আঁচ করতে পারেনি অভিযান পরিচালনাকারীরা কোন বাহিনীর লোক। তারা ভেবেছে প্রতিপক্ষের লোক। এলাকার প্যাটার্ন অনুযায়ী ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য যে ধরনের পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন সে ধরনের প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল বলেও সূত্রের ধারণা।
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীরা পাহাড় কেটে প্লটবাণিজ্য করছে কয়েক দশক ধরে। বছরের পর বছর ধরে সেখানে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লটবাণিজ্য। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন সেবা সংস্থার বিশেষ করে বিদ্যুৎ, পানির জোগান কিভাবে যাচ্ছে, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সলিমপুরে চলে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের রমরমা ব্যবসা। সেখানকার প্রবেশপথে সশস্ত্র প্রহরা যেমন থাকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কদাচিৎ অভিযানে গেলে নিমিষেই সরে পড়ার সুযোগ রয়েছে সন্ত্রাসীদের।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি হয়ে উঠেছে ভাড়াটে খুনি-সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সেখানে অবৈধ অস্ত্রের নিরাপদ মজুদ বাড়ছে বলেও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের দাবি।
বরাবরই এসব সন্ত্রাসী রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছেন বছরের পর বছর। সেখানে বর্তমানে সন্ত্রাসী ইয়াছিন ও সন্ত্রাসী রোকনের আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই। এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সন্ত্রাসী ইয়াছিন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের লোক ছিল। ইয়াছিন এখন নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর লোক হিসেবে পরিচয় দেয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রোকনও পরিচয় দেয় আসলাম অনুসারী হিসেবে। তবে আসলাম চৌধুরী বিবৃতি দিয়ে তাদের দাবি অস্বীকার করেছেন।
এ দিকে সন্ত্রাসীদের এই অভয়ারণ্যে যৌথবাহিনীর অভিযান পরিচালনায় সময় ক্ষেপণ হওয়াতে এরই মধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা যেমনি গা ঢাকা দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি অস্ত্রের মজুদও সরিয়ে ফেলবে বলে সুত্রের ধারণা। ফলে যৌথ বাহিনীর অভিযান কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসানের কাছে অভিযান কবে নাগাদ চালানো হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমরা এখনো অভিযানের জন্য জেলা পুলিশের চাহিদা (রিকয়ারমেন্ট) পাইনি। চাহিদা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার জঙ্গল সলিমপুরে বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে সেখানে চট্টগ্রামের আলোচিত তিন সন্ত্রাসী উপস্থিত থাকার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বেলা ৩টার দিকে অভিযানে যান র্যাব সদস্যরা। অভিযান চালিয়ে র্যাব সদস্যরা সন্ত্রাসী ইয়াছিনসহ কয়েকজনকে পাকড়াও করে।
কিন্তু মুহূর্তেই অভিযানকারী র্যাব সদস্যদের কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ করে বেদম মারধর করতে থাকে এবং সিএনজি অটোরিকশায় তুলে তিন কিলোমিটার দূরের নিজামপুর এলাকায় অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাদের হামলায় নিহত হন র্যাব-৭ এর ডিএডি নায়েব সুবেদার আব্দুল মোতালেব।