আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া আমদানিকারকদের সমন্বিত কারসাজি

এলপি গ্যাসে কৃত্রিম সঙ্কটের নেপথ্যে সিন্ডিকেট

Printed Edition

আশরাফুল ইসলাম

দেশে যখন এলপি গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার সরকারি তথ্য রয়েছে, ঠিক তখনই বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র সঙ্কট। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় ১২ কেজির সিলিন্ডার মিলছে না, কোথাও কোথাও দাম পৌঁছেছে দুই হাজার টাকার কাছাকাছি। প্রশ্ন উঠছে- এই সঙ্কট কি বাস্তব, নাকি পরিকল্পিত? অনুসন্ধানে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া কয়েকটি এলপি গ্যাস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সিন্ডিকেটই বাজার অস্থির করার মূল কারিগর।

সরকারি নথিতে যা পাওয়া গেছে

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন। পরবর্তী মাস ডিসেম্বর ২০২৫-এ সেই আমদানি আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ আমদানি বৃদ্ধির পরও বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট হয় যে সঙ্কটটি প্রকৃত নয়, বরং কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট।

সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে এলপি গ্যাস টার্মিনালগুলোতে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও বাজারে সঙ্কট তৈরি হওয়াকে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘কাগজে-কলমে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সরবরাহ কমে যাচ্ছে- এটি স্পষ্টভাবে কারসাজির ইঙ্গিত।’

সিন্ডিকেটের কৌশল : সরবরাহ চেইনে কৃত্রিম বাধা

সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত কয়েকটি বড় এলপি গ্যাস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের সাথে সমন্বয় করে কখনো আমদানি কমানো, কখনো ডিপো থেকে সরবরাহ সীমিত রাখা কিংবা পরিবহন ধীরগতির মতো কৌশল ব্যবহার করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে। এর ফলে খুচরা পর্যায়ে সঙ্কট তৈরি হয় এবং দাম বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপি গ্যাস বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব এবং দুর্বল নজরদারিই সিন্ডিকেটের শক্তি বাড়িয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো পিছিয়ে ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েকটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান একযোগে একই কৌশল প্রয়োগ করছে-নির্ধারিত সময়েও এলপি গ্যাসবাহী জাহাজ খালাসে বিলম্ব, ডিপো থেকে ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ সীমিত রাখা, পরিবহন সঙ্কটের অজুহাতে সিলিন্ডার বাজারে না ছাড়া, খুচরা ডিলারদের কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবে বাড়তি দামে বিক্রির চাপ। একাধিক ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরবরাহ চাইলে বলা হচ্ছে- ‘গ্যাস নেই’, অথচ একই সময়ে কিছু নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে বাড়তি দামে সিলিন্ডার যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগ ও প্রভাব

তথ্য বলছে, আলোচ্য আমদানিকারকদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লাইসেন্স পেয়েছে। সেই সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাজারের বড় অংশ দখলে নেয় তারা। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত অডিট ও নজরদারি না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান কার্যত ‘অপ্রতিরোধ্য’ হয়ে ওঠে।

একজন সাবেক জ্বালানি কর্মকর্তা বলেন, ‘তখন রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছিল। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারত না। সেই সুযোগেই একটি শক্ত সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে।’

ভোক্তা ভোগান্তি, প্রশাসনের অসহায়ত্ব

সঙ্কটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। রাজধানীর একটি বস্তি এলাকায় একজন গৃহিণী বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস পাচ্ছি না। দোকানে গেলে বলে নেই, আর পেলেও দাম বেশি।’ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, মাঠপর্যায়ে তথ্য না পেলে ব্যবস্থা নেয়া কঠিন। কারণ, কাগজে-কলমে সরবরাহ স্বাভাবিক দেখানো হচ্ছে।