কৃত্রিম উপাধি অথবা তোষামোদের মধ্যে শ্রদ্ধা ও সম্মান থাকে না। মানুষের জন্য কাজ করলে, মানুষের ভালোবাসা থেকেই শ্রদ্ধা পাওয়া যায়। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমতার চর্চা ছিল। নথিপত্রে রাষ্ট্রপতির নামের আগে ‘মহামান্য’, প্রধানমন্ত্রীর নামের আগে ‘মাননীয়’ লিখতে হতো। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ‘মহোদয়’ বলে সম্বোধন করা একরকম বাধ্যতামূলক রীতি ছিল। বুধবার এক পরিপত্রের মাধ্যমে সামন্তবাদী কৃত্রিমতা ভেঙে দিয়েছে সরকার।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সাথে দাফতরিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও সারসংক্ষেপ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাদের পদবির আগে সম্মানসূচক শব্দ হিসেবে যথাক্রমে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ শব্দ লিখিতভাবে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এই সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়, অহেতুক আড়ম্বর ও দাসত্বমনোভাব থেকে বের করে আনার সাহসী উদ্যোগ। আমরা যখন বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন দাফতরিক যোগাযোগ থেকে এ ধরনের তোষামোদি প্রথার অবসান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক মাইলফলক।

আমাদের সবচেয়ে গভীর ও পবিত্র সম্পর্ক হলো মা-বাবার সাথে। আমরা মা ও বাবাকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি, তাদের ভালোবাসি। এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য বাবাকে ‘মাননীয় বাবা’ অথবা মাকে ‘মহামান্য মা’ বলে ডাকার দরকার হয় না। কেবল ‘বাবা’ এবং ‘মা’ বলে সম্বোধন করলে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান বিন্দুমাত্র কমে না। অথচ আমাদের দেশে পদের অধিকারীদের নামের আগে বিশেষণ যুক্ত করা এবং আমলাদের ক্ষেত্রে ‘স্যার’ সম্বোধনকে একরকম বাধ্যতামূলক করে দেয়ার অসুস্থ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল।

মাঠ প্রশাসনে এমন চিত্র বারবার দেখা গেছে— কোনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ না বলে ‘ভাই’ বা ‘আপা’ সম্বোধন করলে অনেকে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেন। এমনকি কোথাও কোথাও নাগরিককে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। এক নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার সময় ‘স্যার’ না বলে ‘আপা’ সম্বোধন করায় এক ব্যবসায়ীকে লাঠিপেটা করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। অথচ সংবিধানে আছে— প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। সরকারি কর্মচারীরা জনগণের প্রভু নন, সেবক।’ আইনের কোথাও সাধারণ জনগণের জন্য সরকারি কর্মচারীদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ ডাকা বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

এই পরিপত্র জারি হওয়ায় এর প্রভাব আমলাদের মধ্যেও পড়বে বলে আমরা আশা করি। যেখানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেই ‘মাননীয়’ বলে সম্বোধন করতে বারণ করে দেয়া হয়েছে, সেখানে তার সরকারের কোনো দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা তোষামোদ পাওয়ার জন্য বাড়াবাড়ি করার সাহস দেখাবেন না বলেই আশা করি। এতে আমলাতন্ত্রের অহেতুক দাপট কমবে। একই সাথে সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের ‘প্রভু’ ভাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের কাছাকাছি গিয়ে সেবা দিতে উদ্বুদ্ধ হবেন। প্রশাসনিক স্তরগুলোতে অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক কমে তৈরি হবে সমতা ও পেশাদারিত্ব। সাধারণ মানুষ সরকারি দফতরে যেতে নিঃসঙ্কোচ বোধ করবেন। অধিকার দাবি করা সহজ হবে। জনবান্ধব প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে এটি সহায়ক হবে।

ভাষাগত পরিবর্তন হলো চিন্তার পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। এখন কাজের ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে মানুষ। প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত হলে এর সুফল মিলবে। প্রশাসনসহ দেশের প্রতিটি স্তরে এর প্রতিফলন আশা করছি। সরকারের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই।