মৌলভীবাজার-৩ আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই
চমক দেখাতে চায় ১১ দল প্রার্থী পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি
Printed Edition
শংকর দুলাল দেব রাজনগর (মৌলভীবাজার)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার-৩ সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে ঘিরে এ আসনে চমক দেখাতে চায় ১০ দলীয় ঐক্যজোট, আর দীর্ঘদিন পর আসনটি পুনরুদ্ধারে এখন মরিয়া বিএনপি। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় মুখর এ অঞ্চলের গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার ও জনপদ। ভোটারদের মধ্যেও বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ, যা গত ১৬-১৭ বছরে দেখা যায়নি।
হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফার (রহ.) স্মৃতিবিজড়িত প্রবাসী অধ্যুষিত রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বরাবরই বেশি। সে কারণে সব দলই জয় নিশ্চিত করতে মাঠে জোর প্রচার চালাচ্ছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে দোয়া ও সমর্থন চাইছেন।
এ আসনে প্রার্থী চূড়ান্তকরণ নিয়ে ১০ দলীয় ঐক্যজোটে শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড় নেয়। প্রথম দিকে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আব্দুল মান্নানকে (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক) প্রার্থী ঘোষণা করা হলে তিনি ব্যাপক প্রচার শুরু করেন এবং ভোটারদের মধ্যে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। এতে বিএনপির প্রার্থী সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমানের জেষ্ঠ্য ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য এম নাসের রহমানের সাথে তার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
কিন্তু শেষ পর্যায়ে জোটের আসন ভাগাভাগির সিদ্ধান্তে আব্দুল মান্নানকে বাদ দিয়ে এ আসনে খেলাফত মজলিসের জেলা সেক্রেটারি মাওলানা আহমদ বিলালকে (দেয়াল ঘড়ি প্রতীক) চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ১০ দলীয় জোট থেকে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। এ দিকে তিনি যাতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে না পারেন এজন্য তার সমর্থকেরা সারা দিন তার বাড়ি ঘেরাও করে রাখেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। ফলে ১০ দলীয় ঐক্য থেকে দুইজন প্রার্থীসহ মোট চারজন প্রার্থী এখন এ আসনের নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
বর্তমানে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান (ধানের শীষ), খেলাফত মজলিসের মাওলানা আহমদ বিলাল (দেয়াল ঘড়ি), জামায়াত নেতা আব্দুল মান্নান (দাঁড়িপাল্লা) এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির জহর লাল দত্ত (কাস্তে)। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবার দলটির কোনো প্রার্থী নেই। জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলও এ আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি।
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আহমদ বিলাল বলেন, জোটের পক্ষ থেকে আমাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তরুণ ও সাধারণ ভোটাররা পরিবর্তন চায়। তাই জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।
অন্য দিকে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আব্দুর রহিম রিপন ও রাজনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম সেলুন বলেন, নাসের রহমান আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতা। সাধারণ ভোটাররা তাকে বিজয়ী করতে আগ্রহী। ধানের শীষের পক্ষে দলের সব স্তরের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
এ আসনের নির্বাচনী ইতিহাসেও রয়েছে নানা উত্থান-পতন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের আজিজুর রহমান জয়ী হন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির এম সাইফুর রহমান নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সৈয়দ মহসীন আলী বিজয়ী হন। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেছার আহমদ জয়ী হন। আর ২০২৪ সালে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, একটি পৌরসভা ও ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৩ আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৭৫টি। মোট ভোটার চার লাখ ৮৬ হাজার ২১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৩১ জন, নারী দুই লাখ ৩৮ হাজার ৭৭ জন এবং ট্রান্সজেন্ডার ভোটার রয়েছেন চারজন। সব মিলিয়ে ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে মৌলভীবাজার-৩ আসনের লড়াই। কে হাসবেন শেষ পর্যন্ত সে অপেক্ষায় এখন পুরো এলাকার জনগণ।