রাফাহ ক্রসিং খোলার পর চিকিৎসার অপেক্ষায় গাজার গুরুতর আহতরা
ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান সাবেক ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মিসরের সাথে থাকা গাজার রাফা ক্রসিং সীমিত আকারে খুলে দেয়ার পর জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডটি ছাড়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে হাজারো অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনি। প্রায় দুই বছর বন্ধ রাখার পর রোববার পরীক্ষামূলকভাবে খোলার পর গতকাল সোমবার থেকে গাজায় ঢোকা ও ভূখণ্ডটি থেকে ফিলিস্তিনিদের বের হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে ইসরাইল। আপাতত এটি প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে খোলা থাকবে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। এ সময়ের মধ্যে গাজা থেকে মিসরে ঢুকতে পারবে সর্বোচ্চ ১৫০ জন এবং গাজায় প্রবেশের অনুমতি পাবে ৫০ জন। গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেছেন, অন্তত সাড়ে ৪০০ রোগীর অবস্থা খুবই গুরুতর, তাদেরকে জরুরি ভিত্তিতে গাজা ভূখণ্ডের বাইরে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আবু সালমিয়া বলেন, ‘আমাদের জানানো হয়েছে আজ কেবল পাঁচজন রোগী, প্রত্যেকে দুই সঙ্গী নিয়ে রাফা ক্রসিং অতিক্রম করতে পারবে। আমরা গাজা থেকে রোগী ও আহতদের চিকিৎসার জন্য বাইরে নেয়ার বিষয়ে আমরা সুস্পষ্ট পদ্ধতি চাই।’
সোমবার গাজা ছাড়ার অনুমতি পাওয়া দুই শিশুর খবর জানিয়েছে আলজাজিরা। সোমবার সকালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে তাদেরকে ফোন করে গাজা ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে এক শিশুর বয়স ২, শার্পনেলের আঘাতে তার অন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণে অন্ধত্ব বরণ করা ১২ বছর বয়সী আরেক শিশুও গাজার বাইরে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে। যে এলাকায় বিস্ফোরণটি হয়েছিল সেখানেই পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে শিশুটিও আশ্রয় নিয়েছিল।
এ দিকে অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনিদের নিতে রাফার মিসর অংশে কয়েক শ’ অ্যাম্বুলেন্স সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছে। ফিলিস্তিনি রোগীদের ভর্তি করতে দেড় শ’ হাসপাতাল ও ৩০০ অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রয়েছে বলে মিসরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আল-কাহেরা নিউজ। আহত ও অসুস্থদের চিকিৎসায় ১২ হাজার চিকিৎসক ও জরুরি ভিত্তিতে সাড়া দিতে সক্ষম এমন ৩০টি দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ইসরাইল রাফা ক্রসিং বন্ধ করে দেয়ার পর বাইরে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা অন্তত এক হাজার ২৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দ্রুত গুরুতর অসুস্থ ও আহতদের গাজা ছাড়ার সুযোগ করে না দিলে এই সংখ্যা বাড়বে বলেও আশঙ্কা করছে তারা।
ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান সাবেক ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের
গাজা ও পশ্চিমতীরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ৪০০-এর বেশি সাবেক ইউরোপীয় কূটনীতিক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ইইউ নেতাদের কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা অব্যাহত সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করেন। খবর দ্য গার্ডিয়ানের। বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায়েই ইসরাইলি সামরিক অভিযানে অন্তত ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের মধ্যে ১০০ জন শিশু। পাশাপাশি গাজায় ত্রাণ প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ এবং পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমে বসতি সম্প্রসারণ দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে দুর্বল করছে। স্বাক্ষরকারীরা ইইউ-ইসরাইল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি স্থগিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানবাধিকার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই চুক্তি বহাল রাখা উচিত নয়। এ দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, গাজায় শীতকাল, অপর্যাপ্ত আশ্রয় ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে শ্বাসযন্ত্রের রোগ বেড়েছে এবং অন্তত ১১ শিশু হাইপোথার্মিয়ায় মারা গেছে।
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে স্কুল ও শরণার্থী তাঁবুতে হামলা, শিশুসহ নিহত ৩
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই ইসরাইলি হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি তিন বছর বয়সী শিশু রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ গাজায় পৃথক হামলায় একটি স্কুল এবং বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দেয়া তাঁবু লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে স্বাস্থ্য সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের মাওয়াসি এলাকায় সমুদ্রপথে গোলাবর্ষণে বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে হামলা চালানো হয়। এতে তিন বছর বয়সী ইয়াদ আহমদ আল-রাবাইয়া নিহত হয় এবং আরো কয়েকজন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খান ইউনুসের পূর্বে ‘ইয়েলো লাইন’-এর পেছনে অবস্থান নেয়া ইসরাইলি সামরিক যান থেকে ভারী গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে একজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। অন্য দিকে উত্তর গাজার জাবালিয়া আল-বালাদ এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দেয়া একটি স্কুলে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে আরো একজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং কয়েকজন আহত হন, যাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব হামলা অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এতে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
পশ্চিমতীরে বিস্ফোরক দিয়ে বাড়ি ধ্বংস
অধিকৃত পশ্চিমতীরের হেবরনের উত্তরে হালহুল শহরে একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। স্থানীয় সূত্র জানায়, মধ্যরাতের আগে একাধিক দিক থেকে শহরে প্রবেশ করে সেনারা মাহমুদ ইউসুফ মোহাম্মদ আবিদের পরিবারের বাড়ি ঘিরে ফেলে। সেনারা আশপাশের বাড়ির বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেয় এবং সকাল পর্যন্ত কাউকে ঘরে ফিরতে দেয়নি। পরে আবিদ পরিবারের তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বিস্ফোরক স্থাপন করে তা উড়িয়ে দেয়া হয়। ২৩ বছর বয়সী মাহমুদ আবিদ গত জুলাইয়ে গুশ এতজিওন বসতিতে একটি হামলার অভিযোগে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। ওই ঘটনায় আরেক ফিলিস্তিনি যুবক মালিক ইব্রাহিম সালিমও নিহত হন। ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই ধরনের গৃহধ্বংস আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ সমষ্টিগত শাস্তির শামিল। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমে অভিযান, গ্রেফতার ও সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে তারা জানিয়েছে। এ দিকে আল-আকসা মসজিদের দক্ষিণে সিলওয়ান এলাকার আল-বুস্তান মহল্লায় ১৪টি ফিলিস্তিনি বাড়ি ভাঙার নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। রোববার সন্ধ্যায় বাসিন্দাদের কাছে নোটিশ পাঠিয়ে বলা হয়, অনুমতি ছাড়া নির্মাণের অজুহাতে এসব বাড়ি ধ্বংস করা হবে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীন জেরুসালেম গভর্নরেট এক বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্তকে ‘আল-আকসার আশপাশে ফিলিস্তিনি উপস্থিতি মুছে ফেলার পরিকল্পিত পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এই বাড়িগুলো ভেঙে সেখানে তথাকথিত ‘বাইবেলিক্যাল গার্ডেন’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। গভর্নরেট জানায়, এই সিদ্ধান্তে অন্তত ১২০ জন ফিলিস্তিনি বাসিন্দার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বহু পরিবার কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাস করছে এবং ইতোমধ্যে ইসরাইলি পৌরসভার আরোপিত জরিমানা বাবদ তারা বিপুল অর্থ ক্ষতির শিকার হয়েছে। ফিলিস্তিনি পক্ষ বলছে, এটি জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের ধারাবাহিক অংশ, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
জেনিনে অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিলো ইসরাইলি বাহিনী
অধিকৃত পশ্চিমতীরে জেনিন শহরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ভারী সামরিক বুলডোজার নিয়ে প্রবেশ করে অবকাঠামো ধ্বংস করেছে। আলজাজিরার খবরে বলা হয়, শহরের পশ্চিমাংশের হাইফা স্ট্রিট এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়। জেনিন শরণার্থীশিবিরে ইসরাইলের আগ্রাসনের এক বছর পূর্তির দিনেই এই ধ্বংসলীলা চালানো হয়, যেখানে আগের অভিযানে হাজারো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। জেনিনের গভর্নর কামাল আবু আল-রুব আলজাজিরাকে বলেন, ইসরাইল কর্তৃপক্ষ জেনিন ও শরণার্থীশিবিরে সামরিক অভিযান মার্চ মাস পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, এই অভিযানের কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং এটি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে তুলছে। একই দিনে ইসরাইলি বাহিনী জেনিনের পশ্চিমে সিলাত আল-হারিছিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে একাধিক বাড়িতে তল্লাশি চালায়। পাশাপাশি শহরের দক্ষিণের কয়েকটি গ্রামেও অভিযান চালানো হয়।
ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের নিন্দা আরব ও মুসলিম দেশগুলোর
গাজায় প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য ইসরাইলের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে একাধিক আরব ও মুসলিম দেশ। কাতার, জর্দান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে এই অবস্থান জানান। খবর মিডলিস্ট আই-এর। বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলায় হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত ও আহত হয়েছেন এবং এসব পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মন্ত্রীরা সতর্ক করেন, এই পরিস্থিতি উত্তেজনা আরো বাড়াতে পারে এবং গাজায় স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে। শনিবার গাজায় চালানো ইসরাইলের ভারী বিমান হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হন বলে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিনটি শিশুও রয়েছে। হামলায় ঘরবাড়ি, বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু ও একটি পুলিশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসরাইল দাবি করেছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়ায় তারা হামলা চালিয়েছে। তবে আঞ্চলিক শক্তিগুলো বলছে, এসব হামলা গাজায় মানবিক সঙ্কট আরো গভীর করছে।