পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে অনেক প্রশ্ন সহজে দূর হবে না

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মোদির বিজেপি প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে জয়লাভ করেছে। কিন্তু এই ভোট এমন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যা সহজে দূর হবে না। প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলকে হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চল থেকে পৃথক করে তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন এমন একটি ছক তৈরি করেন, যার মাধ্যমে কোনো ভূখণ্ডে ধর্মীয় পরিচয়কে চিহ্নিত করে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যায়। যদিও ১৯১১ সালে এই বিভাজন বাতিল করা হয়, তবুও এটি এই অঞ্চলে এক নতুন রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দিয়েছিল, যা ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। এর ফলে নানা ধারার জাতীয় ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, যিনি বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জন সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর ভারত-শাসিত কাশ্মিরকে দেয়া বিশেষ মর্যাদার তিনি বিরোধিতা করেছিলেন। ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহ পরই বিতর্কিত অঞ্চলটির আংশিক স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে মোদী মুখার্জির স্বপ্ন পূরণ করেন।

সোমবার রাতে তার দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে মোদী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের এই জয় “তার [মুখার্জির] আত্মায় শান্তি আনবে”।

সরকার-নিযুক্ত আমলাদের দ্বারা পরিচালিত একটি স্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা ইসিআই ২০১৪ সাল থেকে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। বিরোধী দল এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো এর বিরুদ্ধে ভোট চুরি, জালিয়াতি, কারচুপি এবং অতি সম্প্রতি ভোটার তালিকার একটি বিতর্কিত সংশোধনের অভিযোগ তুলেছে, যার ফলে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ইসিআই এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করলেও, কলকাতাভিত্তিক একটি স্বাধীন গবেষণা সংস্থা ‘সবার ইনস্টিটিউট’-এর করা পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়ার একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, মুসলিমরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, বিশেষ করে সেসব জেলায় যেখানে তারা জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এবং নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারতেন।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার যোগেন্দ্র যাদবের মতে, ২৭ লাখ ভোট বাতিল হওয়াটা পশ্চিমবঙ্গের মোট প্রদত্ত ভোটের ৪.৩ শতাংশ, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপির ব্যবধান ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। মঙ্গলবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার একটি কলামে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রশ্নটি এড়ানো যায় না : যদি এই ২৭ লাখ ব্যক্তিকে ভোট দিতে দেয়া হতো, তাহলে ফলাফলে তার কী প্রভাব পড়ত?’ তিনি বিরোধীদের প্রতি আহ্বান জানান, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এই ‘সাজানো নির্বাচনী ফলাফলকে’ বৈধতা দেয়া বন্ধ করতে।

বিজেপি কি বাংলায় আসাম মডেল অনুসরণ করবে?

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই ঐতিহাসিক জয় একটি পরিচিত নির্বাচনী কৌশলেরই অংশ, যেখানে মুসলিমবিরোধী মনোভাব উসকে দেয়া একটি প্রধান স্তম্ভ। তাদের নির্বাচনী ভাষণে, মোদিসহ দলটির নেতারা মুসলমানদের “বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী” বলে অভিযুক্ত করেছেন এবং রাজ্য থেকে এই “অবৈধ অভিবাসীদের” বিতাড়িত করতে হিন্দু ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ দখল করায়, কথিত ‘অবৈধ’ মুসলিম বাসিন্দাদের ওপর দমনপীড়নের আশঙ্কা আরো ব্যাপক হবে।

যে রাজ্যটি রাস্তার ধারের খাবারের দোকানগুলোতে গরুর মাংসসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ ও গোশতের সুস্বাদু খাবারের জন্য বিখ্যাত, সেখানে নিরামিষভোজনের ওপর জোর দেয়া এবং তার প্রচারকে উড়িয়ে দেয়া কঠিন। অন্যান্য বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিজেপি-শাসিত সরকার গোশত, বিশেষ করে গরুর গোশত বিক্রি ও খাওয়ার ওপর নিয়মকানুন আরোপ করার চেষ্টা করেছে। হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই প্রধান খাদ্য মাছ। পশ্চিমবঙ্গে শুধু প্রোটিনের উৎসই নয়; এটি বাঙালি সংস্কৃতিরও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা দিয়ে বিয়ে এবং এমনকি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও সম্পন্ন করা হয়। নির্বাচনে জিতলে বিজেপি মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ওপর নজরদারি করবে এই আশঙ্কা দূর করতে দলের অনেক নেতাকে হাতে মাছ নিয়ে প্রচার চালাতে দেখা গেছে। বাস্তবে, বিজেপি বিভিন্ন রাজ্যে এক ভিন্ন ধরনের “ডাবল-ইঞ্জিন” সরকার গঠন করেছে এবং বিশেষ করে প্রতিবেশী রাজ্য আসামের একটি সরকার, পশ্চিমবঙ্গের জন্য কী অপেক্ষা করছে তার একটি আভাস দেয়।

আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ যথাক্রমে ২৬৩ কিমি (১৬৩ মাইল) এবং দুই হাজার ২১৬ কিমি (এক হাজার ৩৭৭ মাইল) সীমান্ত ভাগ করে বাংলাদেশের সাথে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যা ১৯৭১ সালে ভারতের সামরিক সহায়তায় পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ঔপনিবেশিক মানচিত্রকাররা উপমহাদেশকে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রে বিভক্ত করার অনেক আগে থেকেই, বর্তমান বাংলাদেশের মানুষজন এখানকার ধানক্ষেত ও চা বাগানে কাজ করার জন্য বর্তমান আসামে অভিবাসন করে আসছিল।

আজ আসামের ৩ কোটি ১০ লাখ বাসিন্দার এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম, যা ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শতাংশ। ঐতিহাসিকভাবে, তাদের বেশির ভাগই ধাপে ধাপে এই উত্তর-পূর্ব রাজ্যে অভিবাসন করে এসেছে। এই বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিমরা, যাদের অবজ্ঞাসূচকভাবে ‘মিয়া’ বলা হয়, তারা কয়েক দশক ধরে বিদেশীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছেন, যা ২০১৬ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি সমর্থন করে আসছে।

১২৬ সদস্যের আসাম বিধানসভায় ১০২টি আসন পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ২০২১ সালের চেয়েও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফিরেছেন। এই বিপুল বিজয়ের ফলে আরো কঠোরপন্থী শর্মা মুসলিমদের ওপর তার আক্রমণ আরো বাড়িয়ে দেবেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে তিনি ও তার সরকার এই সম্প্রদায়কে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে এবং বাড়িঘর ভেঙে দিয়েছে। একটি বিতর্কিত আসন পুনর্বিন্যাসের ফলে রাজ্যের বিশাল মুসলিম ভোটার গোষ্ঠী আগের তুলনায় অনেক কম প্রভাবশালী হয়ে পড়েছে। আসামে বিরোধী কংগ্রেসের যে ১৯ জন বিধায়ক জয়ী হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১৮ জনই মুসলিম যা রাজ্যের ধর্মীয় মেরুকরণের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত।

শর্মা এই বছর তার নির্বাচনী ভাষণে আরো কঠোর দমনপীড়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং ‘অবৈধ বাংলাদেশী মুসলিমদের’ ‘মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার’ অঙ্গীকার করেছেন। তিনি একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড) বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা একটি বিভাজনমূলক প্রস্তাব এবং ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনকে প্রতিস্থাপন করবে। বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে, মানুষের কথিত জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ এবং তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’ সম্পর্কিত আইন পাস করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। ‘লাভ জিহাদ’ একটি ভিত্তিহীন ডানপন্থী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যা মুসলিম পুরুষদের বিরুদ্ধে হিন্দু নারীদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার জন্য বিয়ের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ তোলে।

সমালোচকরা প্রায়শই বিজেপিকে একটি ‘নির্বাচনী যন্ত্র’ বলে থাকেন। ২০২৫ সালে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক রিফর্মস’-এর একটি মূল্যায়ন অনুসারে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী রাজনৈতিক দল, যার মোট আয় ৭১২ মিলিয়ন ডলার, যেখানে এর নিকটতম জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের আয় প্রায় ৯৬ মিলিয়ন ডলার। লেখক ও সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় যেমনটা একবার বলেছিলেন, ‘এ যেন ফেরারি আর সাইকেলের মধ্যে দৌড়।’

এখন যেহেতু এই ‘যন্ত্রটি’ ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ফলাফল এনে দিয়েছে, রাজ্য নির্বাচনের এই ফলাফল মোদিকে তার তৃতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে আরো শক্তিশালী করেছে। তবে, এই ফলাফল ভারত আরো স্বৈরাচারী হয়ে উঠছে কি না, সে সম্পর্কেও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। দেশটি কি একদলীয় আধিপত্যের দিকে এগোচ্ছে? এবং বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল গণতন্ত্রে নির্বাচন কি আর অবাধ ও সুষ্ঠু হবে? (সংক্ষেপিত)