২০১৯ সালের কথা। জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীর তার নিজ কার্যালয়ে তারই অধীনস্থ এক নারী সহকর্মীর সাথে অনৈতিক কর্মে জড়িয়ে জনরোষে সেখান থেকে পালাতে বাধ্য হন। এ ঘটনার পর ২০২১ সালে আলোচিত মডেল পরীমণির সাথে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার মো: গোলাম সাকলায়েনের অনৈতিক সম্পর্কের বিষয় প্রকাশ পায় এবং অনাকাক্সিক্ষত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। বাদ যায়নি কূটনীতিক অঙ্গনও। ২০২২ সালে ইন্দোনেশিয়ায় কাজী আনারকলি নামে বাংলাদেশী কূটনীতিককে মাদক ও অনৈতিক কাণ্ডের জেরে সে দেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। জার্কাতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন এই কাজী আনারকলি একজন নাইজেরিয়ান নাগরিকের সাথে লিভ টুগেদার করতেন। শুধু তাই নয়, তার সাথে নাইজেরিয়ার আলোচিত মাদক মারিজুয়ানাও পাওয়া যায়। এখন আবার শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিনের এক নারীর সাথে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে। গত ২১ জুন নয়া দিগন্তে ‘কর্মক্ষেত্র থেকে পালিয়েছেন শরীয়তপুরের ডিসি’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিনের একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ঘটনা জানার পর নিজের ব্যবহার করা সরকারি গাড়ি এবং সরকারি মোবাইল ফোন রেখে কর্মক্ষেত্র শরীয়তপুর থেকে পালিয়েছেন তিনি। এ তো গেল বিসিএস কর্মকর্তাদের অনৈতিক কাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ফিরিস্তি। আগামী দিনে যারা পদস্থ কর্মকর্তা হবেন তারাও এমন কাণ্ডে পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মেয়ে সহপাঠীকে শার্ট ও মাথায় ক্যাপ পরিয়ে তার হলে নিয়ে রাত যাপন করেছেন। এসব বিষয় যে অনেক শ্রেণিপেশার মানুষকে গ্রাস করেছে এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশের মাধ্যমে সমাজকে কলুষিত করে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কর্মকর্তাদের নৈতিক পদস্খলন রোধে কিছু আইন করে দিলেও রাষ্ট্র বিষয়গুলোর গভীরে কখনো হাত দেয় না। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র সবার মধ্যে চাপিয়ে দেয়ার কারণেই হয়তো এটি করা হয় না। কিন্তু কেউ অনৈতিক জীবনে জড়িয়ে যাওয়ার পর ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে যখন লাঞ্ছনা নেমে আসে তখন অনেকের মধ্যেই বিষয়গুলো গভীর ভাবনার উদ্রেক করে। কেন এমন হচ্ছে এবং এগুলো থেকে মুক্তির উপায় কী তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।

২.

আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আলাক-১) কুরআনে জ্ঞানার্জনের জন্য প্রভুর নামে পড়ার যে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে তা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। প্রভুর নামে পড়ার অর্থ শুধু কোনো কিছু পড়ার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পড়া শুরু করা নয়। এর অর্থ ব্যাপক ও বিস্তৃত। প্রভুর নামে পড়ার মাধ্যমে আল্লাহকে জানা ও মানা অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রখ্যাত কবি, গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিকের একটি গানের কথা এরকম, ‘যে জানে না তোমাকে সে জানে না কিছুই/জানে না সে জীবনের অথৈ মানে/ যে মানে না তোমাকে সে মানে না কিছুই/গভীর আঁধার তারে সতত টানে।’ যে শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে জানতে ও মানতে পারে না, সে শিক্ষার কোনো মূল্য নেই।

আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানবজাতির কল্যাণ সাধন করার জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান-১১০) পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতির শিখরে উঠে মানুষের কল্যাণ করছে সত্য, কিন্তু সে জ্ঞানের অপব্যবহারেও তারা পিছিয়ে নেই। তারা চাইলেই পরমাণু অস্ত্র দিয়ে মানুষকে হত্যা করছে, যা আল্লাহকে জানা ও মানার শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি সম্ভব হয়েছে মানুষের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার কারণে।

আমরা যে জ্ঞানার্জন করছি তার কল্যাণ ও অকল্যাণের দিকগুলো ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ। যেখানে ধর্মের কোনো স্থান নেই। অথচ এ দেশের মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ধর্মকেন্দ্রিক। ধর্ম এখানকার মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দৈনন্দিন জীবনে ধর্মের ব্যবহার ব্যতীত মানুষের জীবন যেন অচল! এই যে ধর্মহীন শিক্ষার আস্ফালন তা দেশের মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও চাওয়া-পাওয়ার সাথে সাংঘর্ষিক।

সম্প্রতি ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. শামছুল আলমের নেতৃত্বে এক সভায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার সর্বস্তরে ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন। দাবিটি ছোট আকারে করা হলেও এর যথার্থতা অনেক। আমরা সারা জীবন এমন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি না যে শিক্ষা আমাদের ধর্ম ও বিশ্বাসের উন্নতি না করে অবনতি ঘটায়। আমাদের কাক্সিক্ষত সুন্দর জীবনকে ধ্বংসের পথে উদ্বুদ্ধ করে। জীবনকে অনৈতিকতার দিকে নিয়ে যায়।

৩.

বাংলাদেশের ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তা নিয়োগ করে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন-বিপিএসসি। বিপিএসসি ক্যাডার সার্ভিসের পরীক্ষার যে সিলেবাস নির্ধারণ করেছে সেখানে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর নম্বর রাখা হয়েছে। সেই সিলেবাসের আলোকে যেসব পরীক্ষা হয়েছে তাতে দেখা গেছে, ধর্মের কোনো ছাপ নেই। বিশেষত ইসলাম ধর্মের। যেখানে ধর্মকে কেন্দ্র করে নৈতিকতার শিক্ষা আবর্তিত হয় সেখানে ধর্মহীন নৈতিকতার শিক্ষা শিক্ষার্থীদের কিভাবে উপকার করছে তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।

৪.

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা আমাদের সমাজেরই মানুষ। আমাদের মধ্য থেকে তাদের বেড়ে ওঠা। আমরা যে শিক্ষা পেয়ে বড় হচ্ছি তারাও তার ব্যতিক্রম নন। সুতরাং যে বিচ্যুতিগুলো আমাদের ব্যক্তিজীবনে কলঙ্ক ডেকে আনছে, পদস্থ কর্মকর্তারাও তার বাইরে যেতে পারছেন না। নৈতিক শিক্ষার অভাবে প্রতিনিয়ত তাদের নৈতিক পদস্খলন দেখতে হচ্ছে। এতে যেমন তাদের জীবনে লাঞ্ছনা নেমে আসছে তেমনি জনগণের মধ্যেও তাদের বিষয়ে বিরূপ মনোভাব গড়ে উঠছে। সরকারের উচিত জনপ্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নৈতিক মানের উন্নতি ঘটানো।

৫.

গত সরকারের সময় শেখ হাসিনা শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রবর্তন করেছিলেন। শুদ্ধাচার পুরস্কার দেয়ার অন্যতম মানদণ্ড ছিল পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা, সততার নিদর্শন, নির্ভরযোগ্যতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, শৃঙ্খলাবোধ, সহকর্মী ও সেবাগ্রহীতার সঙ্গে আচরণ প্রভৃতি। এসব মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তাকে শুদ্ধাচার পুরস্কার দেয়া হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, যারা এসব পুরস্কার পেয়েছেন তাদের অনেকেই নৈতিক পদস্খলনের দায়ে দায়ী হয়েছেন। আইন-কানুন আর পদকের মাধ্যমে যে মানুষের মধ্যে সততা ও নৈতিকতা জন্ম হতে পারে না তা শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রবর্তনের মাধ্যমেও অনেকটা পরিষ্কার।

৬.

পদস্থ কর্মকর্তাদের অনৈতিক কাণ্ডে জড়ানোর অপরাধে শাস্তির বিধান তাদেরকে এ থেকে রেহাই দেয়নি। এগুলো থামছে না; বরং একের পর এক ঘটেই চলছে। নৈতিক পদস্খলনজনিত কাজ বন্ধে আইনের প্রয়োজন রয়েছে সত্য। সে আইন অনেক কঠোরও হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু আইন দিয়ে সব কিছুর মোকাবেলা করা যায় না। বিশেষ করে নৈতিক শিক্ষার বিষয়গুলো আইন দিয়ে মোকাবেলা করতে গেলে সমস্যার প্রত্যাশিত সমাধান মেলে না। পদস্থ কর্মকর্তাদের নৈতিক পদস্খলন রোধে আইনের পাশাপাশি নৈতিক প্রশিক্ষণ প্রদানে জোরদান এবং তার চর্চা অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। তবেই কেবল নৈতিক পদস্খলন কমবে।