সুমাইয়া জামান

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমাদের সীমান্ত এলাকাগুলোতে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পুশইন বা অনুপ্রবেশের ঘটনা। ভারত নানা অজুহাতে এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেদেশের অনেক নাগরিককে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার এই অপচেষ্টা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতায় এক বিরাট হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। পুশইন কেবল সীমান্ত চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিপন্থী নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

গত কয়েক সপ্তাহে দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে পুশইনের একাধিক চেষ্টা হয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়ে এবং সাহসিকতার সাথে বেশ কিছু পুশইন নস্যাৎ করে দিয়েছে। ভৌগোলিক জটিলতার সুযোগ নিয়ে অরক্ষিত বা নদীতীরবর্তী সীমান্ত পথগুলো ব্যবহার করছে বিএসএফ।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কখনো তার ভূখণ্ডে অন্য কোনো দেশের নাগরিকদের অনধিকার প্রবেশ মেনে নিতে পারে না। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ জড়িয়ে আছে।

জোর করে অন্য একটি দেশের সীমানায় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফের মানুষ ঠেলে দিয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান খোঁজার অনৈতিক মানসিকতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে। এই চরম সংবেদনশীল সঙ্কট থেকে স্থায়ীভাবে পরিত্রাণ পেতে হলে বাংলাদেশকে বহুমাত্রিক, দীর্ঘমেয়াদি এবং দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো একক উপায়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং এ জন্য প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের কঠোরতা ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতার এক সমন্বিত কৌশল।

প্রথমত, আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতায় কোনো প্রকার নমনীয়তা দেখানো যাবে না। ভারতের সাথে অনতিবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আহ্বান করে পুশইনের ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে হবে। দুই দেশের মধ্যে অতীতে সম্পাদিত সীমান্ত চুক্তিগুলোর ধারা স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্পষ্ট জানাতে হবে; সীমান্ত দিয়ে যেকোনো ধরনের পুশইন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশকে তথ্য-প্রমাণসহ জোরালো অবস্থান নিতে হবে, যাতে এ ধরনের অপকর্ম বন্ধ করতে বাধ্য হয় ভারত।

দ্বিতীয়ত, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জনবল বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং গোয়েন্দা তৎপরতা আরো জোরদার করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের অনেক সীমান্ত এলাকা অত্যন্ত দুর্গম, পাহাড়ি কিংবা নদীমাতৃক, যেখানে সাধারণ টহল দেয়া কঠিন। এসব অরক্ষিত পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টার নজরদারিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, নাইট ভিশন ড্রোন, আধুনিক রাডার ব্যবস্থা এবং সেন্সর নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে হবে, যাতে রাতেও কোনো অনুপ্রবেশের চেষ্টা সফল হতে না পারে। বিজিবিকে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৌশলগতভাবে আরো শক্তিশালী ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।

তৃতীয়ত, পুশইনের এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে সীমান্তের দু’পাশে শক্তিশালী দালাল চক্র ও মানবপাচার নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে। দেশের অভ্যন্তরে থাকা এসব দেশদ্রোহী ও অপরাধী চক্র চিহ্নিত করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় দালালদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালিয়ে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। টাকার বিনিময়ে যারা দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলছে, তাদের প্রতি শিথিলতা প্রদর্শন আত্মঘাতী হবে।

চতুর্থত, সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের এই প্রতিরোধ লড়াইয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে। সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন পরিষদ, গ্রাম পুলিশ এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। প্রতিটি সীমান্ত গ্রামে ‘ডিফেন্স কমিটি’ বা নাগরিক নজরদারি দল গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তির উপস্থিতি দেখাশোনায় বিজিবি বা স্থানীয় প্রশাসনকে যেন অবহিত করতে পারে- এমন একটি কার্যকর ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সীমান্ত সুরক্ষা দ্বিগুণ শক্তিশালী করবে।

পঞ্চমত, চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে, যদি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান না আসে, তবে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলের দ্বারস্থ হতে হবে। পুশইন যে একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, তা জাতিসঙ্ঘ, ওআইসি এবং বিশ্ব-সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরতে হবে। বিশ্বমঞ্চে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করতে পারলে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে, যা দিল্লি এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়।

সীমান্ত একটি মানচিত্রের রেখা নয়, এটি একটি দেশের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতীক। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক নির্যাতিত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। নতুন করে আর কোনো পুশইন সহ্যের ক্ষমতা নেই। তাই জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঢিলেমির কোনো অবকাশ নেই। সরকার দূরদর্শিতা, সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে সীমান্ত সঙ্কট মোকাবেলা করবে। দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা নেবে।