লে. কর্নেল (অব.) মোঃ শাহাদাত হোসেন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। গত কয়েক মাসে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে উভয় দেশই তাদের সম্পর্ককে আরো বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ পর্যায়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী। একজন বাংলাদেশি হিসেবে এবং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ও চীনা ভাষা প্রচারে সম্পৃক্ত একজন কর্মী হিসেবে এই পরিবর্তনগুলো আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি।
১৯৮৮ সালে যখন প্রথম চীনা ভাষা শেখার যাত্রা শুরু করি, তখন কল্পনাও করিনি যে একদিন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে এত দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ হবে। পরবর্তীকালে চীনে অধ্যয়ন, বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, এবং We Speak Chinese Club Bangladesh Limited (WSCC)-এর কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে যে রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি শুধু চুক্তি, ঋণ বা অবকাঠামো নয়; বরং মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার মানসিকতা।
২০২৪ সালের ২০ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ ভবনে “China-Bangladesh Relations and Belt and Road Initiative” শীর্ষক একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। সেখানে চীন ও বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং নীতিনির্ধারণী মহলের প্রতিনিধিদের আলোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ক্রমেই প্রতীকী বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগভিত্তিক অংশীদারিত্বে পরিণত হচ্ছে।
সম্প্রতি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।
তবে আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতিতে বিশ্বাসী। তাই কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া নয়, বরং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। আমার বিশ্লেষণ ভুলও হতে পারে, কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে এমনটাই মনে হয়।
বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে আমি প্রায়ই একটি প্রশ্ন করি—কোন প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে?
আমার মতে, আগামী দিনের সহযোগিতায় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। দেশের আটটি বিভাগে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে উন্নয়নের সুফল আরো সমভাবে ছড়িয়ে পড়বে। একইভাবে ঢাকা-কেন্দ্রিক উচ্চগতির রেল যোগাযোগ দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলো ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। একই সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘদিন চীনা ভাষা শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সাথে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তাই কারিগরি শিক্ষা, ভাষা প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। চীনা ভাষাসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ভবিষ্যতে হাজার হাজার তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যেকোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাবের ওপর। জনগণের হৃদয় ও আস্থা অর্জন করতে না পারলে কোনো প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো তাই সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর পূর্তি আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে আগামী কয়েক বছরে এই সম্পর্ক আরো গভীর হতে পারে। তবে সম্পর্কের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কতগুলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো তার ওপর নয়, বরং কতজন মানুষের জীবনমান উন্নত হলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং কতটা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেল তার ওপর।
সবশেষে, একজন দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক ও অবদানকারী হিসেবে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি অবকাঠামো, বাণিজ্য বা অর্থায়নের পরিসংখ্যানে নয়; বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা আস্থা, বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানে নিহিত। সেই ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, উভয় দেশের জন্যই ভবিষ্যৎ তত উজ্জ্বল হবে।
লেখক: অ্যাডজাঙ্ক্ট প্রফেসর (Adjunct Professor), প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক, We Speak Chinese Club Bangladesh Limited (WSCC)