অধ্যাপক ড. এম ছিদ্দিকুর রহমান খান

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর বেদনাবিধুর ঘটনার পর প্রায় পৌনে তিন শ’ বছর পেরিয়ে গেছে; কিন্তু নবাব সিরাজউদদৌলার নাম এখনো জীবন্ত। ইতিহাসে বহু বিজয়ী বীর কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছেন; কিন্তু পরাজিত হয়েও নবাব সিরাজউদদৌলা ইতিহাসে অমর। তিনি ইতিহাসের নায়ক।

নবাব সিরাজউদদৌলা অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন। পলাশীর যুদ্ধের ইতিহাস যতবার আলোচিত হয়, ২৩ জুন যতবার ফিরে আসে, ততবারই নতুনভাবে উপলব্ধি করা হয়, ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের কথা।

১৭৫৬ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিরাজউদদৌলা বাংলার মসনদে আরোহণ করেন; কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পরই এই তরুণ নবাবকে মোকাবেলা করতে হয় বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সঙ্কটের। এক দিকে ছিল পারিবারিক ও অভ্যন্তরীণ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, অন্য দিকে বাংলায় বাণিজ্য করতে আসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান ঔদ্ধত্য। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছিল। কোম্পানির কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ, অস্ত্র মজুদের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, দস্তক বা বাণিজ্য-ছাড়পত্রের চরম অপব্যবহার, রাজস্ব ও প্রশাসনিক বিষয়ে নবাবের কর্তৃত্ব উপেক্ষা করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড নবাব সিরাজকে উদ্বিগ্ন করে। তিনি উপলব্ধি করেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলার সার্বভৌমত্বের বিরাট হুমকি। কোম্পানির প্রকৃত লক্ষ্য কেবল ব্যবসায় নয়– রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দখল। ফলে তিনি কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। কলকাতা আক্রমণ এবং ফোর্ট উইলিয়াম দখলের মাধ্যমে তিনি বাংলার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন; কিন্তু ইংরেজরা এই ঘটনাকে সিরাজের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ এবং বাংলায় রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। যার চূড়ান্ত পরিণতি পলাশীর ঘটনায়।

পলাশীর ঘটনাকে ইতিহাসে ‘যুদ্ধ’ নামে অভিহিত করা হলেও, বস্তুনিষ্ঠ বিচারে এটি ছিল দেশী-বিদেশী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ইতিহাসের নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতকতার এক পরিকল্পিত নাটক। নবাবের সেনাবাহিনীতে প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য এবং শক্তিশালী কামান থাকলেও জগৎশেঠের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইংরেজের সাথে গোপনে আঁতাতে যুদ্ধক্ষেত্রে মীরজাফর, রায়দুর্লভ ও ইয়ার লুৎফ খানের মতো প্রভাবশালী সেনাপতিরা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও মূক দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই নবাব সিরাজউদদৌলার পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। ইতিহাসবিদ ড. নীহাররঞ্জন রায় এ নির্মম সত্য উন্মোচন করে মন্তব্য করেছেন, পলাশীর যুদ্ধ প্রকৃত অর্থে কোনো যুদ্ধই ছিল না; এটি ছিল বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের সফল পরিণতি। প্রকৃতপক্ষে, ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভের গোলন্দাজ বাহিনীর কামানের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর ও মারাত্মক ছিল নবাব সিরাজউদদৌলার বিরুদ্ধে স্বার্থান্বেষী মহলের চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

ইতিহাসবিদ এস সি হিল যথার্থই লিখেছেন, পলাশীর ফলাফল মূলত যুদ্ধ শুরুর আগেই, যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ–সিরাজ কেবল বিদেশী ইংরেজদের হাতে পরাজিত হননি, তাকে পরাজিত করেছিল তার চার পাশের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, ক্ষমতালোভী অভিজাত শ্রেণী এবং জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বড় করে দেখা সমকালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

মাত্র ২৪ বছর বয়সে নবাব সিরাজউদদৌলার জীবনাবসান ঘটে। তার মৃত্যু একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, এটি ছিল বাংলার স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধিপত্যের দীর্ঘ, অন্ধকার ও শোষণের অধ্যায়। পলাশীর এই ট্র্যাজেডির পথ ধরেই পরবর্তী সময়ে সংঘটিত হয় বক্সারের যুদ্ধ, কোম্পানির দেওয়ানি লাভ এবং পুরো ভারতবর্ষে প্রায় দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজত্ব।

ঔপনিবেশিক, এমনকি ব্রিটিশপন্থী ভারতীয় ইতিহাসচর্চায়ও দীর্ঘদিন ধরে নবাব সিরাজউদদৌলাকে একজন খামখেয়ালি, নিষ্ঠুর প্রকৃতির, বিলাসপ্রিয় ও অযোগ্য শাসক হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা চলেছে। তবে আধুনিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা ও গবেষণা সেই একপেশে ধারণাকে নাকচ করে দিয়েছে। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় তার বিখ্যাত গ্রন্থ সিরাজউদদৌলায় দেখিয়েছেন, সিরাজ সম্পর্কে প্রচলিত বহু অভিযোগ অতিরঞ্জিত, পক্ষপাতদুষ্ট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার মতে, বিজয়ীদের রচিত ইতিহাসে সিরাজকে পরিকল্পিতভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারও স্বীকার করেছেন, সিরাজের ব্যক্তিগত কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও তার বিরুদ্ধে যে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়েছে, তা নিরপেক্ষ ইতিহাসের মানদণ্ডে টেকে না।

বস্তুত আধুনিক ইতিহাস গবেষণা সিরাজউদদৌলাকে একজন দুর্বল শাসক হিসেবে নয়; একটি রূপান্তরমান সময়ের সঙ্কটময় রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো এক সাহসী দেশপ্রেমিক শাসক হিসেবে মূল্যায়ন করে। তাই আজ যখন আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে পলাশী দিবস স্মরণ করি, তখন নবাব সিরাজউদদৌলাকে শুধু করুণ পরিণতির ট্র্যাজিক নায়ক হিসেবে দেখলে অবিচার করা হবে। তাকে দেখতে হবে বিদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধের সাহসী প্রতীক হিসেবে, স্বাধীনতার শেষ প্রহরী হিসেবে এবং জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্যতার চিরন্তন স্মারক হিসেবে।

পলাশীর ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, কোনো রাষ্ট্র কেবল বাহ্যিক শত্রুর আক্রমণে দুর্বল হয় না। অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, ব্যক্তিস্বার্থ, দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিজেদের কুৎসিত চক্রান্তও একটি জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। পলাশীর ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রমাণ।

লেখক : ভিসি, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি

srkhan@du.ac.bd