আমাদের শহর ও পৌর এলাকার কাঁচাবাজারগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়, তার ৭০ শতাংশ খাদ্য ও কৃষিপণ্যের অন্তর্ভুক্ত। তা ছাড়া বাসাবাড়ি হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও কমিউনিটি হলেও এজাতীয় বর্জ্য তৈরি হয়। কিছু দিন আগে নাগরিক সংলাপের ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, দেশে প্রতিদিন আনুমানিক ২৫ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে এ বর্জ্যরে ৫৫ শতাংশ সঠিক ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তা ছাড়া ঢাকার ল্যান্ডফিলগুলোর ৮০ শতাংশ ময়লা (বর্জ্য) দিয়ে ভরাট হয়ে আছে। চট্টগ্রামের ল্যান্ডফিল দুটোর চিত্রও প্রায় একই রকম। আসলে ল্যান্ডফিল বলতে বর্জ্যকে মাটি দিয়ে চাপা দেয়া বোঝায়। আমাদের ল্যান্ডফিলগুলো এ সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না, আমরা বরং বর্জ্য দিয়ে মাটিকে চাপা দিয়ে আসছি।

বাংলাদেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের প্রতিদিন প্রায় ১৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তার মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে দৈনিক উৎপাদিত বর্জ্যরে পরিমাণ প্রায় ছয় থেকে ১১ হাজার ও এবং চট্টগ্রাম নগরীতে এর পরিমাণ প্রায় তিন হাজার টন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সর্বোচ্চ দুই হাজার ১০ টন সংগ্রহ করতে পারে। অবশিষ্ট এক হাজার টন বর্জ্য পড়ে থাকে খাল-নালা ও উন্মুক্ত জায়গায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে জলাবদ্ধতা, দুর্গন্ধ, কীটপতঙ্গের বংশবিস্তার এবং পরিবেশ দূষণ বেড়ে চলেছে। উল্লিখিত বর্জ্যরে ৬৩ শতাংশ পচনশীল, পুনঃচক্রায়নযোগ্য যা থেকে জ্বালানি, বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ, জৈবসার ও মাছ-মুরগির খাদ্য তৈরি সম্ভব।

বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে পচনশীল বর্জ্যকে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই : হেরমেটিয়ার (বিএসএফ) মাধ্যমে আট থেকে ১০ দিনের মধ্যে জৈবসার ও এই পোকার লার্ভা তৈরি করা হয়, যা হাঁস-মুরগি, মাছ ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

‘বিএসএফ’ থেকে উৎপাদিত খাদ্যের বাজারজাতকরণে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নেদারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের ১০টি কোম্পানি। অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য, ২০৩০ সাল নাগাদ বিএসএফের বৈশ্বিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৩৪ শতাংশের বেশি হবে। উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালে এর বাজার ছিল ৪ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৪ সালে দাঁড়াবে ২০ দশমিক ১২ ডলারে। স্মরণযোগ্য, ২০১২ সাল থেকে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া এবং ২০১৭ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন খামারকৃত মাছের খাবারে সম্পূর্ণ বিএসএফ মিল ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।

আমাদের দেশেও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অ্যাকোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আব্দুস সালাম এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) প্রফেসর ড. মোফাজ্জল হোসেনের অধীনে এক দল গবেষক বিএসএফ নিয়ে কাজ করছেন। অন্য দিকে চট্টগ্রামের বায়েজিদ লিঙ্ক রোড, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের স্থায়ী ক্যাম্পাসে বিএসএফের মডেল প্রজেক্ট চলমান আছে। যেখানে এই নিবন্ধের লেখকের তত্ত্বাবধানে দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিদিনের পচনশীল জৈব আবর্জনা থেকে জৈবসার ও হাঁস-মুরগি এবং মাছের খাবার (বিএসএফ লার্ভা) উৎপাদিত জৈবসার ফল বাগানে এবং লার্ভা হাঁস-মুরগির এবং মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করে আশানুরূপ ফল পেয়েছেন। তা ছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগ্রহী অনেক তরুণ উদ্যোক্তাকেও সহযোগিতা করা হচ্ছে।

বিএসএফ প্রসঙ্গে কিছু তথ্য

১. বিএসএফের বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা

তাদের জীবনচক্র মাত্র ৪৫ দিন (ডিম, লার্ভা, পিউপা ও মাছি)। একটি মাছি ৪০০ থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত ডিম দেয়। ডিম থেকে হ্যাচিংয়ের মাধ্যমে চার-পাঁচ দিনে বেবি লার্ভা উৎপাদন করা হয়। এই বেবি লার্ভা যেকোনো পচনশীল ময়লা জৈব আবর্জনাকে দ্রুত খেয়ে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়, ফলে ল্যান্ডফিলে কম বর্জ্য যায়, পরিবেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে জলাবদ্ধতা তৈরি করে না, দুর্গন্ধ ছড়ায় না এবং মিথেন গ্যাস নির্গমণও কমিয়ে আনে।

২. উৎপাদিত উপকরণ ও ব্যবহারসমূহ

আমাদের গবেষণা ও বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, এক টন পরিমাণ রান্নাঘর ও ডাইনিং হলের পচনশীল আবর্জনা থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত লার্ভা এবং সমপরিমাণ জৈবসার উৎপাদন করা যায়। তবে লার্ভা ও জৈবসার উৎপাদনের পরিমাণ নির্ভর করে আবর্জনার ধরনের ওপর। বিএসএফের লার্ভায় উচ্চমানের (৬০ শতাংশ পর্যন্ত) প্রোটিন থাকায় বিশ্বব্যাপী হাঁস-মুরগি, মাছ, বিড়াল, কুকুর ও অন্যান্য পশুর ব্যয়বহুল প্রচলিত খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। লার্ভা থেকে নিষ্কাশিত তেল (প্রতি কেজিতে ২৪০ এমএল) যানবাহনের জ্বালানি হিসেবে এবং পশুখাদ্যে সয়াবিন তেলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

৩. আয়-ব্যয়

প্রতিদিন ১০০ কেজি বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনা থেকে মাসে হাঁস-মুরগির খাবার (লার্ভা) তৈরি হয় প্রায় ৬০০ কেজি এবং সমপরিমাণ জৈবসার, ব্যয় বাদে আয় দাঁড়ায় প্রায় ২০-২৫ হাজার টাকা। তবে যাদের প্রতিদিনের বর্জ্যরে জোগান নেই এবং উৎপাদিত লার্ভা (মাছ ও হাঁস-মুরগির খাবার) নিজের খামারে ব্যবহার বা বিক্রয় করার ব্যবস্থা নেই, তাদের এ কাজে নিরুৎসাহিত করা উচিত। কারণ তারা লাভের পরিবর্তে লোকসানে পড়ে যাবেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ইউটিউব চ্যানেলগুলোর ৯৫ শতাংশ তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই, এগুলোর খপ্পরে পড়ে অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন।

৪. বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থান

বাতাস চলাচল করে এমন ঘর, পরিত্যক্ত বাড়ি বা মুরগির খামারির মতো ঘরেও এর চাষ করা যায়। বেবি লার্ভাকে আবর্জনা খাওয়ানোর ক্ষেত্রে লেয়ার মুরগি পালনের মতো ভার্টিক্যালি প্লাস্টিকের গামলায় বা ১০০ কেজি ধারণক্ষমতা বিশিষ্ট (দৈর্ঘ্য সাত ফুট, প্রস্থ চার ফুট এবং উচ্চতা আট ইঞ্চি) পাকা হাউজ ব্যবহার করা যায়। হাউজের মাপ যেকোনো আকারের হতে পারে, তবে উচ্চতা আট ইঞ্চি হলেই চলে। আমরা বছরে একটি হাউজ বা একটি পাত্র ৩০ বার (১০ দিন অন্তর অন্তর) ব্যবহার করতে পারি। অর্থাৎ ওই ব্যবস্থাপনায় খুব অল্প জায়গার প্রয়োজন হয়।

৫. জলাবদ্ধতা নিরসনের উদাহরণ

বিএসএফের জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কেনিয়ার নাইরোবিকে আকস্মিক বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে নাইরোবিতে দৈনিক ছয় হাজার টন বর্জ্য এবং পূর্ব আফ্রিকায় প্রায় এক হাজার কৃষক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিএসএফ ব্যবহার করছে। এ প্রক্রিয়ায় তারা জৈবসার এবং হাঁস-মুরগির বিকল্প খাবার উৎপাদন করছে।

৬. জনসাধারণের করণীয় ও দায়িত্ব

উদাহরণস্বরূপ জাপানের কামিকাতসু বিশ্বের প্রথম আবর্জনামুক্ত শহর। তারা তাদের আবর্জনাকে ৩২টি ভাগে বিভক্ত করে। জাপানি সম্প্রদায় পরিচ্ছন্নতাকে গুরুত্ব দেয় এবং সবাই মিলে তা বজায় রাখেন। জাপানের অনেক শহরে কোনো ডাস্টবিন নেই, তারা বাইরে ময়লা না ফেলে নিজের বাসায় নিয়ে আসেন। একইসাথে বিভক্ত করে নির্দিষ্ট স্থানে রাখেন বা নিজে দিয়ে আসেন, তাতে রিসাইক্লিংয়ের সুবিধা হয়। এ ছাড়া ল্যান্ডফিল খুব অল্প পরিমাণ ময়লা যায়। এ দিকে আমরা মুসলমানেরা বলে থাকি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা পালন করি না, ময়লায় হাত দিতে লজ্জা পাই, তার জন্য আমাদের বিশেষ পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন, যাদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অনুপাতিক হারে খুব কম। অথচ সারা দেশের রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা একমাত্র তাদের দায়িত্ব। অন্য দিকে আমরা জনসাধারণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ দায়িত্ব চাপিয়ে দেই সরকারের ওপর, আর সরকার নির্ভরশীল হয় বিদেশী প্রযুক্তি ও অনুদানের ওপর।

বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ফিলিপাইন ও আফ্রিকার আদলে বিএসএফ ব্যবহার করে শহর ও পৌর এলাকার পচনশীল আবর্জনা (দৈনিক ১০ হাজার টন) জৈবসারে এবং উচ্চমানের প্রোটিনে রূপান্তর করতে পারি। জৈবসার আমাদের মৃত্তিকার জৈব পদার্থের ঘাটতি (যার পরিমাণ ৫ শতাংশে থাকা উচিত কিন্তু আমাদের অনেক আবাদি জমির মাটিতে ১ শতাংশের নিচে আছে) পূরণে সহায়ক হবে। তা ছাড়া মৎস্য ও পোলট্র্রি শিল্পে বাজারের তৈরি ফিডের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনবে। রাসায়নিক সার ও মৎস্য এবং পশুখাদ্য আমদানিতে সরকারের আর্থিক সাশ্রয় হবে। অন্য দিকে বিএসএফের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে। এ ব্যবস্থায় রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে, কোনো দুর্গন্ধ থাকবে না, শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার নিরসন হবে, ল্যান্ডফিলে কম ময়লা যাবে এবং অল্প জায়গার প্রয়োজন হবে। তা ছাড়া গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমিয়া আনবে। বিএসএফের জন্য কাঁচামাল (বর্জ্য), পরিবেশ ও মানবসম্পদ আমাদের আছে। এ প্রকল্পের কোনো ঝুঁকি নেই এবং তার প্রযুক্তি বা আর্থিক সহায়তায় কোনো বিদেশী সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হবে না।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে হাঁস-মুরগি ও মাছের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে আমদানি করা খাবারের ওপর। এ সমস্যার সমাধানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিএসএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর বাস্তবায়নে নাগরিক পর্যায় থেকে সচেতনতা দরকার; যাতে পচনশীল ময়লা আলাদাভাবে নির্দিষ্ট পাত্রে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট জায়গায় সরবরাহ করে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সহযোগিতা করা হয়। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিএসএফ ব্যবহারের লক্ষ্যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও সংশ্লিষ্ট মহলকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

m.a.kashem@cu.ac.bd