গত ৪ জুন সমকাল পত্রিকার ই-পেপারে ‘বঙ্গবন্ধুসহ ৪ শতাধিক নেতার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিল’ শীর্ষক লিড নিউজ দেখে বিস্ময়ের সাথে সাথে কিছুটা ভড়কেও যাই। কারণ, কয়েক মাস আগে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রিসেট বাটন পুশ সংক্রান্ত এক বক্তব্য ঘিরে তাকে বেশ বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালায় তথাকথিত একাত্তরের চেতনাধারী ফ্যাসিবাদী শক্তি। মনে প্রশ্ন জাগে, এখন আবার এটা কিভাবে সম্ভব হলো? ফেসবুকেও দেখলাম, অনেকে এ খবর দেখে সরকারের সমালোচনা করছেন। ভাবছিলাম, সরকারের উপদেষ্টারা কিভাবে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন? সরকার শেখ মুজিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করবে আর সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা দেবে না তা তো হতে পারে না। এসব ভাবতে ভাবতে মিডিয়ায় সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর বক্তব্য পেলাম। তিনি বললেন, নিউজটি ভুয়া। তার বক্তব্য দেখে স্বস্তি পেলাম। কিন্তু সত্যটা কী?
২.
শেখ হাসিনার শাসনামলে একজন মানুষের নামে মামলা দিতে এতটুকু যথেষ্ট ছিল যে, তিনি শেখ হাসিনাবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত। ফ্যাসিবাদী জমানায় রাস্তাঘাটে কথা বলতে খুব সতর্ক থাকতে হতো আশপাশে কেউ তা যেন শুনতে না পান। সে এক দুর্বিষহ জীবন। আর কারো কাছে ধর্মীয় পুস্তক থাকলে তাকে যেন নানা অভিধায় অভিহিত করে মামলা দেয়া ছিল পুলিশের নিত্যদিনের কর্ম (পড়তে হবে অপকর্ম)। এভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদের ওপর নিকৃষ্টতম নির্যাতন চালিয়েছেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা।
এখন কোনো ভয় নেই। মানুষজন মুক্ত। মনের ভাব প্রকাশে কোনো বাধা নেই। যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাওয়া যায়। এটা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন। ড. ইউনূস সরকারের কৃতিত্ব। এসব কারণে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা সমর্থন করি। এ সরকার কোনো বিষয়ে কাজ করে সমালোচনার মুখে পড়ুক এমনটা দেশপ্রেমিক কেউ চান না।
৩.
৪ জুন সমকালের লিড নিউজে বলা হয়েছে, “মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামানসহ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী চার শতাধিক রাজনীতিবিদের (এমএনএ-এমপিএ) মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগ থেকে প্রকাশ করা অধ্যাদেশে এসব নেতার পরিচয় ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।”
সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন স্বয়ং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। বুধবার (৪ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাসহ মুজিবনগর সরকারের নেতাদের ‘মুক্তিযোদ্ধার’ স্বীকৃতি বাতিলের খবর সঠিক নয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সেক্রেটারি ফয়েজ আহম্মদ তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘সামান্য একটি বাংলায় লেখা অধ্যাদেশ পড়তে বা বুঝতে না পারা কি এই ধরনের কাগজের রিপোর্টারের জন্য স্বাভাবিক! নাকি এই সরকার কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ করে না বলে আমাদের এই সাংবাদিক বন্ধু নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন? মিথ্যা, বানোয়াট এবং ভুয়া সংবাদ কি জাতিকে উদ্ধার করে নাকি বিপদে ফেলে, তারা বুঝতে পারছেন কি?’
আরেক ধাপ এগিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের খেতাবসংক্রান্ত খবরটি ভুয়া, মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। যারা এখন থেকে ভুল সংবাদ প্রকাশ করবেন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ করবেন, যেগুলো মানুষকে বিভ্রান্ত করবে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।
৪.
সমকালের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ. কে. আজাদ পতিত শেখ হাসিনা সরকারের সর্বশেষ ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন। তিনি দেশের একজন শিল্পপতিও বটে। জুলাই বিপ্লবের সময় বেশির ভাগ মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ঠিক তখন এ. কে. আজাদসহ ফ্যাসিবাদের দোসর ব্যবসায়ীরা রাজধানীতে এক সম্মেলন করে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। সম্মেলনে এ. কে. আজাদ তার বক্তব্যে একটি জনপ্রিয় গানের চরণ উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনাকে চিরকাল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দেখার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেন এভাবে, ‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই, শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকে চাই। ভীষণ অসম্ভবেও তোমাকে চাই।’ এমন একজনের মালিকানাধীন পত্রিকায় ভুয়া প্রতিবেদন প্রকাশ করবে- এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী জনগণের জন্য এবং দেশের জন্য এটি উদ্বেগের। এ প্রতিবেদন শুধু যে সমকাল করেছে বিষয়টি তেমন নয়, আরো বেশ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা করেছে।
৫.
প্রশ্ন হলো, জাতীয় দৈনিকগুলো কেন এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করল? এটা কি নিছক প্রতিবেদকের বোঝার ভুল? নাকি ড. ইউনূস সরকারের প্রতি জনমনে বিদ্বেষ জন্মাতে ইচ্ছাকৃত অপচেষ্টা? কিংবা এটি কি কোনো পক্ষকে মাঠে নামানোর অপকৌশল? ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সরকারের তরফ থেকে সব সময় বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনা সরকারের মতো এখন আর কোনো মিডিয়া হাউজে নিউজের জন্য ফোন করা হয় না। ঠিক এ কারণে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংকোচবোধ করছে না। সংকোচ থাকারও কথা না। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম কয়েক মাস আগে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘আমরা চাই সাংবাদিকরা নির্ভয়ে সাংবাদিকতা করবেন, তারা সব ধরনের প্রতিবেদন করবেন। সেই প্রতিবেদন যদি আমাদের বিপক্ষেও হয়, মোস্ট ওয়েলকাম। আমরা সবার ফ্রিডমে বিশ্বাসী।’
কিন্তু কথা বলার সুযোগ থাকলেই কি যা ইচ্ছা তাই বলতে হবে কিংবা লিখতে হবে? সমকালসহ কয়েকটি পত্রিকায় মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিলসংক্রান্ত নিউজ পরিবেশনের ধরন দেখে এটাই স্পষ্ট হয়েছে যে, এটি করাই হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে।
৬.
গত বছরের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও যেসব গণমাধ্যম ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে সেগুলো রয়ে গেছে বহাল তবিয়তে। স্বৈরাচারসমর্থক গণমাধ্যম অটুট রয়েছে। কর্মরত ও সক্রিয় আছেন ফ্যাসিবাদের দোসর অনেক সাংবাদিক। এমনকি এসব গণমাধ্যম যে ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করেছিল তারও কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। সরকারও ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে যাওয়া গণমাধ্যমের বিষয়ে কোনো রকম ব্যবস্থা না নিয়ে বরং এগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। শুধু সরকার একা নয়, অপ্রিয় হলেও সত্য, ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলগুলোও এগুলোর পাশে শক্তভাবে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে যেসব গণমাধ্যমকর্মী ফ্যাসিবাদী জমানায় অন্যায়ভাবে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন, বছরের পর বছর বিনাবেতনে কিংবা সামান্য বেতনে অনাহারে, অর্ধাহারে থেকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন, কথা বলেছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কাজ করেছেন, দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে দুঃসহ দিন পার করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার না দিয়েছে তাদের ত্যাগের স্বীকৃতি, না নিয়েছে কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা!
সরকার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। দুঃখজনক হলো, তারা খোঁজার চেষ্টা করেনি গণমাধ্যমের শরিক কোন কোন প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বৈধতা দিতে অনবরত বয়ান তৈরি করে সমর্থন জুগিয়েছে। কিভাবে লাভবান হয়েছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন এসব নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে শাস্তির সুপারিশ করলে তা দলিল হিসেবে থাকত এবং ভবিষ্যতে কেউ কোনো শাসককে ফ্যাসিবাদী হতে সাহায্য করার সাহস পেত না।
৭.
মানুষ গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করতে চায়। গণমানুষের এ আস্থা মিডিয়াকে অর্জন করতে হয়েছে। যে কেউ চাইলে এটি বিনষ্ট করতে পারেন না। গণমাধ্যমের বিষয়ে মানুষের মনে সন্দেহ ও সংশয় তৈরি করতে পারেন না। গণমাধ্যম যখন মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অসত্য, অপতথ্য দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তখন সেটা পাঠকের সাথে গাদ্দারি বা প্রতারণা করা হয়।
গণমাধ্যমকে এসব গাদ্দারি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে অসত্য, অপতথ্য প্রদানে বিরত থাকতে হবে। আর জনগণের সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকার সুরক্ষায় এ কাজে সরকারেরও সদা সচেষ্ট হওয়া দরকার।