বাংলাদেশে ফুটবল এখন যেন এক উৎসব। জাতীয় দল আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেললে চার পাশে তৈরি হয় উন্মাদনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিজয়ের স্বপ্ন, আর সমর্থকরা গায়ে জার্সি চাপিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেন, যেন এশিয়া কাপ বা বিশ্বকাপ হাতের নাগালে! নিঃসন্দেহে খেলার প্রতি ভালোবাসা একটি জাতির সাংস্কৃতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ। তবে প্রশ্ন হলো- এই আবেগের ভিত কতটা শক্ত? এই উল্লাস কি সত্যিই গৌরবের, নাকি এক ধরনের কৃত্রিম আনন্দের খোঁজ?
বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন করতে পারেনি। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও আমাদের অবস্থান এখনো খুব নিচের সারিতে। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে আমরা প্রায়ই ১৮০-এর কাছাকাছি অবস্থানে থাকি। তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক কিছু ম্যাচে ড্র বা সামান্য ব্যবধানে জয়ের ঘটনাকে ঘিরে এমন উল্লাস সৃষ্টি হয়, যেন আমরা ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে রাজত্ব করছি। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন জনগণের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ও আশা প্রকাশ করে, অন্য দিকে তা একটি অস্বাস্থ্যকর আত্মতুষ্টির সংস্কৃতিও জন্ম দিতে পারে। খেলাধুলায় গর্ব তখনই যৌক্তিক, যখন তার পেছনে থাকে প্রকৃত পরিশ্রম, পারফরম্যান্স এবং সাফল্যের ভিত্তি। কেবল আবেগ দিয়ে কোনো ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নেয়া যায় না।
তবে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন ফুটবলপ্রেমীরা। ইংলিশ ক্লাব ফুটবলে খেলা করা ব্রিটিশ-বাংলাদেশী ফুটবলার হামজা চৌধুরী সদ্য বাংলাদেশের জাতীয় দলে যোগ দিয়েছেন। তার মতো প্রবাসী আরো কয়েকজন ফুটবলার দলে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন, যারা ইউরোপের আধুনিক ফুটবলে বেড়ে উঠেছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই প্লেয়ারদের আগমন আমাদের দলে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা ও শৃঙ্খলা আনতে পারে।
তবে এখানেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবভিত্তিক হওয়া জরুরি। একজন-দু’জন প্রবাসী খেলোয়াড়ের ওপর ভর করে পুরো ফুটবলকাঠামো বদলে যাবে না। এদের সঠিকভাবে দলে গ্রহণ, ট্যাকটিক্যাল মানিয়ে নেয়া এবং স্থানীয় খেলোয়াড়দের সাথে সমন্বয় ঘটানো- এসবের জন্য প্রয়োজন পরিণত ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি। শুধু খেলোয়াড় আমদানির মাধ্যমে নয়, নিজেদের ঘরও গুছিয়ে তুলতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় দল দু’টি ভিন্ন প্রকৃতির দলের মুখোমুখি হয়েছে ভুটান ও সিঙ্গাপুর। ভুটানের বিপক্ষে জয় আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও, সেটিকে খুব বড় অর্জন বলা চলে না। কারণ ভুটান এখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলে একটি দুর্বল প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত। অন্য দিকে সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে ম্যাচে একটি গোল করতে পারা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। এটি আমাদের আক্রমণভাগের সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। তবে বাস্তবতা হলোÑ সিঙ্গাপুর মধ্যমমানের একটি দল এবং তার বিপক্ষে খেলার ধরন দেখে এখনই আত্মতুষ্টিতে ভেসে যাওয়ার সুযোগ নেই; বরং এখান থেকেই আমাদের শেখার আছে কিভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেদ করা যায়, কিভাবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেয়া যায়। এই ফলাফলগুলো আমাদের সামনে সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিচ্ছে ঠিকই, তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে চাই পরিকল্পিত উন্নয়ন ও ধারাবাহিক পরিশ্রম।
বাংলাদেশে ফুটবলের উন্নয়নের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা কাঠামোগত দুর্বলতা। গ্রাসরুট লেভেলে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই, নেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ক্লাব ফুটবলেও দেখা যায় বিদেশী খেলোয়াড়-নির্ভরতা, যার ফলে স্থানীয় খেলোয়াড়দের প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাস সঠিকভাবে গড়ে ওঠে না। ফেডারেশনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অসততা ও স্বচ্ছতার অভাবও উন্নয়নের পথে বড় বাধা। এমন প্রেক্ষাপটে, যে উল্লাস এখন দেখা যাচ্ছে, তা অনেকাংশেই ‘সোস্যাল মিডিয়া নির্মিত’। জনপ্রিয়তা বাড়ানোর লড়াইয়ে অনেকে বাস্তবতার চেয়ে বেশি আশাবাদী বার্তা ছড়াচ্ছে। অথচ প্রয়োজন ছিল, একটি বাস্তবভিত্তিক ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির।
আমরা যদি সত্যিকারের ফুটবল উন্নয়ন চাই, তাহলে প্রথমেই দরকার আত্মবিশ্লেষণ। আমাদের ফুটবল কাঠামোর কোথায় ঘাটতি? কীভাবে স্থানীয় প্রতিভাদের বিশ্বমানের খেলোয়াড়ে পরিণত করা যায়? তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য কী ধরনের প্রশিক্ষণ, সাপোর্ট ও সুযোগ দরকার? একই সাথে মিডিয়া, স্পন্সর এবং সরকারকেও ভূমিকা রাখতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও পেশাদার ফুটবল উন্নয়ন পরিকল্পনায়। শুধু আবেগ নয়, চাই পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং ফলাফলের প্রতি দায়বদ্ধতা।
ফুটবলে উন্মাদনা থাকতে পারে কিন্তু সেই উন্মাদনা যেন বাস্তবতা হারিয়ে না ফেলে। হামজা চৌধুরীর মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের আগমন আমাদের জন্য বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে ঠিকই, তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে চাই ঐক্যবদ্ধ, পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের ফুটবলের সত্যিকারের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন উল্লাসের আগে আমরা করব আত্মবিশ্লেষণ। গঠনমূলক সমালোচনা, কাঠামোগত উন্নয়ন এবং তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণে উল্লেখ করার মতো কিছু অর্জন করতে পারব। তার আগে আমাদের দরকার, চোখ খোলা রেখে স্বপ্ন দেখা।
লেখক : শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি