বিগত সরকারের আমলে এ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ প্রতিটি খাতই সঙ্কটের মুখে পড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এ দেশের অর্থনীতির। এর মধ্যে ব্যাংক খাত অন্যতম। যেকোনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো ব্যাংক বা আর্থিক খাত। এ খাতের সুষ্ঠু বিকাশ অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনে। যে দেশের ব্যাংক খাত যত বেশি নিয়মতান্ত্রিক সে দেশ তত দ্রুত সমৃদ্ধ হয় এবং অর্থনীতি সচল থাকে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। মূলত খেলাপি ঋণের কারণেই ব্যাংকে তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ডিসেম্বর-২০২৪ এর শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২০.২০ শতাংশ। এ সংখ্যার সঙ্গে কোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নেয়া ঋণ ও অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করা হলে পরিমাণটা আরো অনেক বেশি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছে এবং যদিও এটি কার্যকর হবে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে। এ নতুন সংজ্ঞায় বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেকের মতে, এর পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা বেশি।
কোনো ঋণ কেন মন্দ ঋণে পরিণত হয়? কীভাবে আমরা ঋণক্ষতি এড়াতে পারব? ঋণ সাধারণত মন্দ হয় যেসব কারণে, তা হলো ১. ঋণ প্রয়োজনীয়তার দুর্বল মূল্যায়ন, ২. ঋণ সংশ্লিষ্ট ভুল পরিকল্পনা, ৩. প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বা জামানতের ঘাটতি, ৪. ব্যবসায় অভ্যন্তরীণ নগদ অর্থের দুর্বল মূল্যায়ন, পুরনো বকেয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটায়, ৫. ব্যবসায় ভিত্তি কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অথবা এমনকি ধারাবাহিকতার দিকে না তাকিয়ে শুধু ঋণগ্রহীতার নামের ওপর ভর করে ঋণ প্রদান, ৬. প্রতিযোগিতা অথবা উদীয়মান প্রতিযোগিতা সম্পর্কে ব্যাংক কর্মকর্তার অজ্ঞতা এবং ৭. অর্থনৈতিক মন্দা অথবা মূলধারা বাদ দিয়ে অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা বিনিয়োগ। এ কারণগুলোর সঙ্গে আরো যোগ করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের ঝুঁকি বুঝতে না পারার ব্যর্থতা, ঋণ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বা ব্যর্থতা, ন্যূনতম প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারলেও ঋণ দেয়া অথবা যথাযথ নজরদারির অভাব। এমনকি সম্প্রতি আমরা বাংলাদেশে দেখেছি কীভাবে শিল্পঋণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে ‘নেম লেন্ডিং’ বা ‘ইন্ফ্লুয়েন্সড লেন্ডিং’ বলে কথা চালু আছে। এখানে একজন ঋণগ্রহীতা তার ঋণসংশ্লিষ্ট সুনামকে বাজারে সুনাম নেই, এমন কাউকে ঋণ পেতে সহযোগিতা করে।
আমাদের দেশে অবশ্য রাজনৈতিক আনুকূল্যে প্রদত্ত ঋণ বা আদিষ্ট হয়ে ঋণ প্রদানের পরিমাণটাও কম নয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত কিংবা সরকার-ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় এ ঘটনা বেশি ঘটে। প্রভাবশালীদের তোষণ ছিল আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিচিত আচরণ। বড় খেলাপিদের জন্য ২০১৫ সালে এক অভিনব সুযোগ দেয়া হয়েছিল ৫০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণকে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ ডাউন প্রেমেন্ট দিয়ে ১২ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করার বিধানের মধ্য দিয়ে। এই সুযোগে ১৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ থেকে সরিয়ে ফেলা হলেও প্রয়োজনীয় শর্তগুলো শেষ পর্যন্ত পালন করতে পারেনি এসব প্রতিষ্ঠান।
২০১৮ সালে ব্যাংকিং ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনায় কিছু ব্যাংক মালিকের চাপে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। অথচ এই নগদ জমার হার বাজারে অর্থ সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একই গোষ্ঠীর চাপের মুখে বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি তহবিলের ২৫ শতাংশ গচ্ছিত রাখার হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল, যার বিরাট অংশ এখন কয়েকটি অসচ্ছল ব্যাংকে আটকে গেছে। তখনকার অর্থমন্ত্রী বয়োবৃদ্ধ এ এম এ মুহিতকে কিছু ব্যাংক মালিকের কাছে বড় অসহায় মনে হয়েছিল সে সময়।
২০১৯ সালে ২ শতাংশ হারে ডাউন পেমেন্ট, ১০ বছরে পরিশোধ, ক্ষেত্র বিশেষে কস্ট অব ফান্ড কিংবা সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ হারে সুদ আরোপসহ বিভিন্ন লোভনীয় শর্তে পুনঃতফসিল এবং এককালীন নিষ্ক্রান্ত (এক্সিট) হওয়ার আরেকটি সুযোগ দেয়া হয়েছিল খেলাপিদের। তারপরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ উত্তরোত্তর বেড়েই চলছিল। ২০২২ সালে আরো একবার ৫০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ২৯ বছরের মেয়াদে পুনঃ তফসিল করার সুযোগ-সংবলিত তোষণমূলক নীতিমালা জারি করা হয়। এই উদ্যোগ কতখানি সফল হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ নেই। কিছু ব্যাংক মালিকের চাপে (২০২৩), পরিচালকদের মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ১২ বছর। আগের নীতিমালা শিথিল করে কোনো শিল্প বা ব্যবসায়ী গ্রুপে একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলেও গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার সুবিধা অবারিত করে দেয়া হয়।
বহু টানাপড়েন ও গড়িমসির পর ২০২৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনী এনে ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কোনো ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার কঠিন কাজটি ব্যাংকারদেরই করতে হবে। খেলাপি নির্ধারণ কিংবা ঋণ শ্রেণীকরণের কাজগুলোর সুনির্দিষ্ট গাণিতিক নীতিমালায় ব্যাংকাররাই করে থাকেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃত খেলাপি হওয়ার চারটি শর্তের প্রয়োগ ব্যাংকারদের জন্য সত্যিকারের চ্যালেঞ্জিং কাজ। আমাদের দেশে ঋণখেলাপিরা ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে পারেন না, অথচ তাদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার, দামি গাড়ি, সন্তানদের বিদেশে পড়ানো কিংবা বিজনেস ক্লাসে বিদেশভ্রমণ কোনোটিই বন্ধ হয় না। এ বিষয়ে নীতিমালা জারির পর এখন পর্যন্ত কোনো ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
গ্রাহক যে-ই হন অথবা যে ব্যবসাই করুন না কেন, ঋণ কর্মকর্তাদের ব্যবসার জন্য গ্রাহকের কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন এবং কী আদলে তা দেয়া হবে, তা নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। তাই ঋণ দেয়ার আগে ঋণ কর্মকর্তাকে ব্যবসা মডেলের দিকে তাকাতে হবে। দেখতে হবে অনুমতি টার্নওভার কত, ট্রানজেকশনের মেয়াদ বা ধরন। এও দেখা গেছে যে, গ্রাহকের ১৫০ দিনের জন্য ঋণ দরকার অথচ ব্যাংক সময় দিচ্ছে মাত্র ১২০ দিনের। এমন কারণেও কিন্তু ঋণ মন্দ হয়ে পড়ে। ট্রেড সাইকেলের পাশাপাশি আরো কিছুদিন সময় দিয়ে ঋণ পরিশোধের সময় বা কাঠামো ঠিক করা উচিত। আরেকটি বিষয় হলো উদ্যোক্তা যেসব খাতে শক্তিশালী, তার বাইরের ব্যবসা করলে তা ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি বাড়ায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি ব্যবসায়িক বিনিয়োগ নিজ নিজ ক্ষেত্রে জয়ী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে থাকতে হবে, পরাজিতদের সঙ্গে নয়। শুধু ঋণঝুঁকি নয়, পরিচালনগত ঝুঁকি, বাজারঝুঁকি এমনকি সামষ্টিক অর্থনৈতিক বা কান্ট্রি রিস্ক, এমনকি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিকেও বিবেচনায় নিতে হবে। বিবেচনায় নিতে হবে ঋণের বিপরীতে প্রযোজ্য বা উপযুক্ত জামানত ও সহজামানতের বিষয়টিও। নিকট অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার অতিরিক্ত আনুকূল্যের কারণেও অনেক ঋণ মন্দ হয়েছে, এমনকি ঋণের টাকা পাচার হয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া দ্রততার সঙ্গে শেষ করার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশে দেখা যায়, অর্থঋণ আদালত বা নিম্ন আদালত কোনো একটি সিদ্ধান্ত দেয়ার পর গ্রাহক উচ্চ আদালতে রিট করে বসে থাকল, এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকল। এ ব্যবস্থারও পরিবর্তন দরকার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাইলেও রিট করা যাবে না তা নির্ধারণ করে দেয়া দরকার। অর্থঋণ আদালতের পরিসর বাড়িয়ে দ্রত মামলাগুলো নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। পাসপোর্ট জব্দ করে রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ গ্রাহক এবং তার পরিবার যেন নতুন কোনো সম্পদ আহরণ করতে না পারে সে জন্য ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে বিদ্যুৎ, পানিসহ সব ধরনের ইউটিলিটি সুবিধা বাতিল করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। খেলাপি ঋণ গ্রহীতা, তার প্রতিষ্ঠান এবং তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দসহ যাবতীয় সহায়-সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে হস্তান্তর করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সম্পদ বিক্রি করে পুরো ঋণের অর্থ আদায় করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অন্যান্য দেশী-বিদেশী স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে তা বিক্রি করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকার পরিবর্তনের পর সংশ্লিষ্ট সব মহলের আশা খেলাপি তোষণ প্রভাবশালী খেলাপিদের দৌরাত্ম্য, খেলাপি ঋণ আদায়ে গড়িমসির এসব উপসর্গ দূর হবে। কারণ, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংকিং খাত নিয়ে দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। বিগত সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাংক খাতে যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে সারিয়ে তোলার জন্য দরকার হবে সব মহল থেকে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা। একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হতো, ব্যাংকিং খাত সংস্কারে অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্যোগ ও বন্দোবস্ত এই মুহূর্তে খুবই জরুরি। রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, যারা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্য ব্যবসাবিমুখ, তাদের ব্যবসায় ফেরাতে হবে। প্রয়োজনে সরকারের উচিত হবে তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসা। আলোচনার মাধ্যমে তাদের বুঝিয়ে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরানোর উদ্যোগের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ের কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের কৌশলপত্র প্রণয়নের পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকের নতুন ঋণদান কার্যক্রম সীমিতভাবে হলেও চালু রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা ফিরবে এবং নতুন আমানত আকৃষ্ট করা সহজ হবে।
এসব ব্যাপারে অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত জরুরি। ব্যাংক বাঁচাতে এখন শুধু অর্থনীতি অথবা শুধু রাজনীতি এককভাবে কোনোটাই কাজে আসবে না। কারণ, এখন দরকার রাজনৈতিক অর্থনীতির সম্মিলিত সিদ্ধান্ত।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক