নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত দায়িত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সরকার অর্পিত অন্যান্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ ও ওই আইনের অধীন বিধিমালার আলোকে নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে থাকে।
সংবিধানের ১২০ অনুচ্ছেদের নির্দেশনার আলোকে নির্বাহী বিভাগের ওপর যেকোনো নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনকে চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মচারী সরবরাহের ব্যবস্থা করার আবশ্যকতা রয়েছে।
প্রভাবশালী প্রার্থীদের কর্মীরা ভোটারদেরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এবং সাধারণ ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে ভয় পায়। তাই ভয়হীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন তথা রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক ভোটকেন্দ্রের নির্দিষ্ট দূরে ক্যাম্প করে আগত ভোটারদের পরিচয়পত্র যাচাই করে তার ভোটার নম্বর ও ভোট কক্ষের নম্বর দিয়ে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিলে প্রার্থীর কর্মীদের দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ইতঃপূর্বে নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতকৃত নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়ালে তা বর্ণিত থাকলেও তা বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়নি। তাই বর্ণিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে
আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদ ও অন্যান্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচন পরিচালনায় ম্যাজিস্ট্রেট, রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালের অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তব অবস্থার নিরিখে বিদ্যমান আইন বা বিধিমালা সম্পর্কিত কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরতে চাই। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রস্তাবনাগুলো সদয় বিবেচনা করতে পারে।
১. বর্তমানে ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ কোনো কারণে ব্যাহত হলে প্রিজাইডিং অফিসারকে ভোট গ্রহণ বন্ধ করে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে, ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপার ছিনতাই হলেও প্রিজাইডিং অফিসারকে ভোটকেন্দ্র বন্ধ করতে দেখা যায় না। তাই এ ব্যাপারে বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে আরো সুনির্দিষ্ট কঠোর নির্দেশনা দেয়া যায়। বন্ধ ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুনরায় ভোট গ্রহণ করা যায়। এতে কোন প্রার্থীর কর্মীদের ভোটকেন্দ্র দখলের প্রবণতা কমে আসবে।
২. বর্তমানে প্রচলিত নিয়মে ভোটের ব্যালট পেপার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ভোটের আগের দিন ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হয়। তাতে অনেক দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই ব্যালট পেপার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যাদি ভোটের দিন সকালে ভোটকেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। তবে দুর্গম এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ভোটের আগের দিন ব্যালট পেপারসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি পাঠানো যেতে পারে।
৩. বর্তমানে ভোটের দিন এবং তার আগের দিন ভোটকেন্দ্রের নির্বাচনী কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা তাদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। তাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্থানীয়-দলীয় প্রভাবশালী লোকদের মাধ্যমে খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন। তাতে নির্বাচন কোন প্রার্থীর পক্ষে প্রভাবিত হয়। তাই নির্বাচনী সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর খাবারের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে সরকারি স্থানীয় প্রশাসনিক দফতরকে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের খাবারের ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব দেয়া যায়। নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রদেয় ভাতার অর্থ থেকে ওই ব্যয় নির্বাহ হতে পারে।
৪. অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, প্রিজাইডিং অফিসারের জন্য নির্ধারিত কক্ষে ব্যালট পেপার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সুরক্ষার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানে আলমারি বা অন্য কোন ব্যবস্থা থাকে না। যার ফলে নির্বাচনী দ্রব্যাদি কেড়ে নেয়ার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এ জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্বাচন কমিশন থেকে নির্দেশনা দেয়া যায়।
৫. প্রিজাইডিং অফিসারের কক্ষে অবাঞ্ছিত কোন লোক যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া যায়। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সাংবাদিক, নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা প্রিজাইডিং অফিসার থেকে তথ্যাদি জানার জন্য তার কক্ষে প্রবেশ করে থাকেন। এ ব্যাপারে অবাঞ্ছিত কোন লোক যাতে প্রিজাইডিং অফিসারের কক্ষে প্রবেশ করতে না পারে সেই নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা যায়।
৬. ভোটকেন্দ্রের ভোটকক্ষের গোপনীয় কক্ষে বর্তমানে যেনতেন প্রকারের কাপড় দিয়ে আড়াল করা হয়। তাতে অনেক সময় ব্যালট পেপারে সিল মারার সময় অনেক প্রার্থীর এজেন্ট বা অন্যরা দেখে থাকেন। তাই এ ব্যাপারে আরো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রিজাইডিং অফিসারকে নির্দেশনা দেয়া যায়।
৭. প্রিজাইডিং অফিসারকে ভোটকেন্দ্রের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে, যাতে তিনি ভোটকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা ভালোভাবে নিতে পারেন। তাছাড়া ভোটকেন্দ্রের অবকাঠামোগুলো ভোট গ্রহণের অনেক আগে থেকে নির্দিষ্ট করে তার নিরাপত্তার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় মেরামত বা সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে।
৮. বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যয়ের জন্য যে সীমা নির্ধারণ করা আছে তার পরিমাণ কমিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। বর্তমানে জাতীয় সংসদের প্রার্থীর জন্য পোস্টার ছাপানোর ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ করা হয়েছে, তা নির্বাচনী ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। তবে সীমিত পর্যায়ে নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীর প্রতীক ও ছবিসহ কিছু ব্যানার লাগানোর অনুমতি দেয়া যায়। প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় হাট-বাজার বা গ্রোথ সেন্টারে রিটার্নিং অফিসারের উদ্যোগে প্রার্থীদের নিয়ে পরিচিতি সভা করা যায়। যেখানে প্রার্থীর আদ্যাক্ষরের ক্রমানুযায়ী ৫ থেকে ১০ মিনিটের জন্য তার ভবিষ্যৎ জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের বর্ণনা দিয়ে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া যায়। তাছাড়া প্রার্থীদের প্রত্যেককে সরকারি গণমাধ্যম ব্যবহারের সমান সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। বাড়ি বা মহল্লায় সীমিত পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময়ে গণসংযোগ করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। প্রার্থীরা যাতে কোন প্রতিষ্ঠান বা উন্নয়ন কাজের জন্য অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিতে না পারে তার জন্য নির্বাচনী আইনে বা বিধিতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া যায়। তার ব্যতিক্রম হলে নির্বাচনী আইনে শাস্তির ব্যবস্থা কঠোর করা যেতে পারে।
৯. বর্তমানে যে ভোটকেন্দ্র নির্দিষ্ট করা আছে তার থেকে আরো নির্দিষ্ট দূরত্বে এলাকার আয়তন বা দূরত্ব বিবেচনা করে ভোটকেন্দ্র বাড়ানো যেতে পারে। ভোটকেন্দ্র যাতে কোন প্রার্থীর বাড়ি সংলগ্ন না হয় সে বিষয়ে যতদূর সম্ভব সতর্কতা অবলম্বনের জন্য রিটার্নিং অফিসার বা নির্বাচনী কর্মকর্তাকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে।
১০. ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষের প্রবেশপথে সিসিক্যামেরা স্থাপন করে প্রিজাইডিং অফিসার তা মনিটর করতে পারেন। সম্ভব হলে রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তার সংযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন থেকে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
১১. নির্বাচন পর্যবেক্ষক গ্রুপ বাছাইয়ের সময় বিতর্কিত ব্যক্তি বা গ্রুপকে বাদ দিয়ে যথাসম্ভব নিরপেক্ষ দেশী-বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষক গ্রুপকে অনুমতি দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
১২. ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রের নির্দিষ্ট দূরত্বের বাইরে প্রার্থীদের নিজ নিজ কর্মীদের ক্যাম্প স্থাপন করে ভোটারদেরকে ভোটার নম্বর ও ভোট কক্ষের নম্বর সংবলিত স্লিপ দিয়ে থাকে। এতে প্রভাবশালী প্রার্থীদের কর্মীরা ভোটারদেরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এবং সাধারণ ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে ভয় পায়। তাই ভয়হীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন তথা রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক ভোটকেন্দ্রের নির্দিষ্ট দূরে ক্যাম্প করে আগত ভোটারদের পরিচয়পত্র যাচাই করে তার ভোটার নম্বর ও ভোট কক্ষের নম্বর দিয়ে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিলে প্রার্থীর কর্মীদের দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ইতঃপূর্বে নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতকৃত নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়ালে তা বর্ণিত থাকলেও তা বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়নি। তাই বর্ণিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।
১৩. ১৯৯১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জারিকৃত নির্বাচনী আইন-বিধিমালা পরিবর্তিত অবস্থার আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হলে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও দুর্নীতিমুক্ত হতে পারে।
লেখক : সাবেক অতিরিক্ত সচিব