ইতিহাস ও ঐতিহ্যের লীলাভূমি সাতক্ষীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। ১৯৮৪ সালে সাতক্ষীরা জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দেশের অষ্টম বৃহত্তম এই জেলার সাতটি উপজলার জনসংখ্যা প্রায় ২২ লাখ। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সাতক্ষীরা ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। সাতক্ষীরা জেলা চিংড়ি চাষে বিখ্যাত। দেশের রফতানিকৃত চিংড়ির প্রায় ৭০ শতাংশ হয়ে থাকে এই জেলা থেকে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’ রয়েছে এই জেলায়। অন্যতম বৃহত্তম স্থলবন্দর ভোমরার অবস্থানও সাতক্ষীরায়। মৎস্যচাষ, কাঁকড়া, মধু, আম, ডেইরি শিল্প, মৃৎশিল্প, শাকসবজির জন্য সাতক্ষীরা সুপরিচিত।
এত সম্ভাবনা থাকার পরও সাতক্ষীরা উন্নয়নবঞ্চিত। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসাসহ প্রয়োজনীয় সামাজিক অবকাঠামোর অনেকটাই জরাজীর্ণ ও অপ্রতুল। বিশেষ করে জেলা শহরের সাথে সংযোগকারী অনেক প্রধান সড়ক ও আন্তঃউপজেলা সড়ক ভাঙাচোরা, কাঁচা বা সংস্কারহীন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রম করলেও আধুনিকতা ও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এই জেলায়। সেই কবে ১৯৮০ সালে ৩৩ একর জমিতে তৎকালীন বস্ত্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মনসুর আলীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস, যা সাতক্ষীরার একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল। দেশের অন্যতম লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে খোলার চেষ্টা করা হলেও মিলটি এখনো বন্ধ আছে। বিগত সরকারের সময় উন্নয়নের অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল কিন্তু শুধু একটি মেডিক্যাল কলেজ ছাড়া তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
খুলনা বিভাগের একটি ব্যস্ততম সড়ক খুলনা থেকে মুন্সীগঞ্জ ও ভোমরা থেকে খুলনা সড়ক। সাতক্ষীরা-মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত বর্তমান সড়কে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। এই সড়কের পিচ উঠে সড়কে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। এতে সড়কে অহরহ ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এ সড়ক ধরেই সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন দেশী-বিদেশী পর্যটক এবং রাজধানী ঢাকার সাথে পণ্য আনা-নেয়া করেন ব্যবসায়ীরা। সাতক্ষীরায় উন্নতমানের স্টেডিয়াম নেই, নেই সুইমিংপুল। মৎস্যচাষে অবদান রাখলেও নেই কোনো গবেষণা কেন্দ্র ও ভালো ফ্রিজিং প্ল্যান্ট।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সরেজমিন পরিদর্শনে সাতক্ষীরা জেলার রাস্তা এবং উন্নয়নের করুণ অবস্থা দেখে যোগাযোগ উপদেষ্টাকে ব্যবস্থা নিতে লিখিত সুপারিশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ মে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রস্তাবে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের খুলনা জোনের ‘সাতক্ষীরা-সখিপুর-কালীগঞ্জ (জেড-৭৬০২) এবং কালীগঞ্জ-শ্যামনগর-ভেটখালী (জেড-৭৬১৭) মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের প্যাকেজ ডব্লিউপি-৫ এর আওতায় কালীগঞ্জ-শ্যামনগর-ভেঠখালী (জেড-৭৬১৭) সড়কের উন্নয়ন।
কালীগঞ্জ ফুলতলা মোড় থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর চৌরাস্তা পর্যন্ত টেন্ডার কাজের ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৩ কোটি ৮৯ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৪ টাকা। এ ছাড়া জেলার উন্নয়নে তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পানিসম্পদ উপদেষ্টার তৎপরতায় উপকূলীয় বেড়িবাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
সাতক্ষীরায় প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে উদ্বাস্তু হচ্ছে হাজারো মানুষ। উপকূলীয় জেলা হিসেবে সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। ফলে এখানকার মানুষকে সুরক্ষিত করতে স্থায়ী বাঁধ, অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারা প্রত্যাশা করে বৈষম্যহীন উন্নয়নের। দেশের অর্থনীতিতে সাতক্ষীরা জেলার যে অবদান ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে নির্ধারণ হোক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
সাতক্ষীরাবাসী আশা করে, ভোমরা বন্দরের উন্নয়ন, সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আধুনিক স্টেডিয়াম ও সুইমিংপুল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র, হ্যাচারি ও আধুনিক ফ্রিজিং প্ল্যান্টসহ অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে সাতক্ষীরারসহ দেশের অর্থনীতি। সাতক্ষীরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা নতুন, আধুনিক ও বৈষম্যহীন সাতক্ষীরা গড়ার স্বপ্ন দেখছি।’ এটি একটি আশাপ্রদ কথা জেলাবাসীর জন্য কিন্তু উদ্যোগ, বাস্তবায়ন ও সহযোগিতা জরুরি। সাতক্ষীরা যেন আর অবহেলিত না থাকে, সেটিই হোক আমাদের সম্মিলিত চাওয়া।