বিশ্বে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের পর থেকেই অল্প কিছু মানুষ প্রতিটি রাষ্ট্রের সব নাগরিককে শাসন করে আসছে। মুষ্টিমেয় মানুষই সরাসরি নীতিনির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন।

সম্প্রতি নারী কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। কমিশন ‘একটি অভিন্ন পারিবারিক আইন’ প্রবর্তনের সুপারিশ করেছে, যা বিয়ে, বিয়েবিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সব বিষয়ে ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ঐচ্ছিকভাবে প্রযোজ্য হবে। এখানে সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কথা বলা হলেও মূলত ‘ইসলাম’ই তাদের নিশানা। কারণ অন্য ধর্মের অনুসারী সংখ্যায় নগণ্য। তারা আমাদের মুসলিম/হিন্দু পারিবারিক আইনকে ঐচ্ছিক করতে চায়। দেশে ধর্মীয় পারিবারিক আইন চায় না এমন মানুষের সংখ্যা আসলে কত? তারা কি কোনো পরিসংখ্যান দেখাতে পারবেন? হয়তো বা সে সংখ্যা যে সংখ্যক যৌনকর্মীকে শ্রমিকের মর্যাদা দিয়ে দেশের তরুণীদের পতিতাবৃত্তির প্রতি আগ্রহী করতে চান, ইসলামের মূলে আঘাত করতে চান, তার ২-৫ শতাংশ হতে পারে। একটি গণমাধ্যমের টকশোতে এসে নারী কমিশনের প্রধান শিরিন পারভীন হক একদম স্পষ্ট ভাষায়, ড্যাম-কেয়ারভাবে বলে দিলেন, কোনো ইসলামিক স্কলারের সাথে কথা বলার, পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজন তারা বোধ করেননি। কারণ তাদের কাজ ধর্ম নিয়ে নয়, রাষ্ট্র নিয়ে। তারা চাচ্ছেন একটি সিভিল আইন তৈরি করতে, যারা ধর্মভিত্তিক আইনের বাইরে গিয়ে জীবন পরিচালনা করতে চান, তাদের জন্য একটি বিকল্প তৈরি করতে। এখানে কি চিন্তার বিষয় নয়, তারা কাদের জন্য এই সিভিল অপশন তৈরি করতে চাচ্ছেন? সমাজে তাদের অবস্থান কোথায়? তাদের সংখ্যাটা কত? আসলে এই প্রক্রিয়ায় কি তারা ধর্মহীন রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান না? তাহলে তাদের মূল টার্গেট ইসলাম নয়?

উপস্থাপকের প্রশ্নের জবাবে শিরিন পারভীন বলেন, (ধর্মীয় ও তাদের প্রস্তাবিত) এই দু’টি আইনের মাধ্যমেই দেশ চলবে। এখানে তিনি কতটা প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন? আমার যখন যেটি সুবিধা হবে যদি তখন সেই আইন মানতে চাই, তাহলে একটি পরিবারে কী পরিমাণ সমস্যা হবে? পরিবারের সদস্যরা কি তাহলে শুধু আদালতেই ঘুরতে থাকবে? এর ফলে কি পরিবারব্যবস্থাই ভেঙে যাবে না? আমরা কি ধরে নিতেই পারি না, পরিবারব্যবস্থা ভেঙে ফেলাই তাদের উদ্দেশ্য?

দেখুন বাংলাদেশের সব মানুষ বিশেষত মুসলমানরা ইসলামের সব বিধান মেনে চলতে না পারলেও ইসলামিক আইন অনুযায়ী বেশ কিছু বিষয়ের ফয়সালা করার চেষ্টা করেন। যেমন- বিয়ে, তালাক, সম্পদবণ্টন ইত্যাদি। মুসলিমদের কেউ কখনো ওই আইন মানতে চান না বলেননি, এমনকি শ্রদ্ধাহীনতার দৃষ্টিতেও দেখেননি; কিন্তু নারী কমিশন উল্লেখ করেছে, যারা ধর্মীয় আইন মানতে চান না, তাদের জন্য তারা একটা বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে চান। আসলে তারা যা চান, তা পিনাকীর ভাষায় ‘ইসলাম কোপানির’ রাজনীতি; কী করে ইসলাম থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে নেয়া যায়।

দেশের ৯০ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কেউ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন না চাইলেও নারী কমিশন এরকম একটি প্রস্তাবনা পেশ করার সাহস কিভাবে পেল? পাশাপাশি কেনই বা প্রকৃত ইসলামপ্রেমী অথবা ইসলামিক স্কলার সেই কমিশনে জায়গা পেলেন না; অন্তত সে বিষয়ে মতামত নেয়ার জন্য নির্বাচিত হলেন না? আমাদের মনে হয়, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট সামান্যসংখ্যক যুবক-যুবতী, যাদের দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা আমাদের দেশের মানুষকে ধর্মহীনতার দিকে নিয়ে যেতে চায়, তাদের জন্য একটি ক্ষেত্র বের করে দেয়ার সুযোগ তারা করে দিতে চান।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাদের নিয়ে নারী কমিশন গঠন করেছিল? সরকার তাদেরকেই কমিশনে নিয়োগ দিয়েছে, যারা কোনো-না-কোনোভাবে তাদের পরিচিত, কাছের মানুষ, সুসম্পর্ক রয়েছে, অথবা যাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এমনও বলা হয়, কমিশনের সদস্যরা যোগ্যতার পাশাপাশি নানা কৌশলে অথবা অন্য কোনোকিছুর বিনিময়ে কমিশনে স্থান দখল করেছেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১০টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো কমিশনেই ধর্মীয় প্রজ্ঞাবান স্কলার নেই।

আসুন, শুধু নারী কমিশনের দু’জনের ব্যাপারে জানার চেষ্টা করি। এই কমিশনের প্রধান শিরিন পারভীন হক, যিনি একজন নারী অধিকারকর্মী। তিনি নারীপক্ষ নামে একটি নারী অধিকার সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। বাংলাদেশে নারী অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা কী চান আর কোন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চান, তা আমাদের অজানা নয়। মাহীন সুলতান, যিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড সোস্যাল ট্রান্সফরমেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং নারীপক্ষের সদস্য। নারী অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা এই কমিশনে থাকবেন এটা স্বাভাবিক; কিন্তু তারা যেসব নারীর অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেন, তাদের বাইরে দেশের সমগ্র নারীসমাজের চিন্তাচেতনার সমন্বয় কি এরা ঘটাতে পারবেন!

তারা দেশের কত শতাংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব করেন? জানা মতে, দেশে বামপন্থীর সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশের মতো। অথচ দেশ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বেশির ভাগ পদে বসে আছে তারাই। আজ শীর্ষস্থানীয় আমলা ও বুদ্ধিজীবীদের হয়তো বা ১-২ শতাংশ ইসলামকে পছন্দ করেন। আর বাকিরা ইসলাম কোপানোর এজেন্ডা নিয়েই থাকেন সবসময়; কিন্তু যারা ব্যক্তিজীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান, তারা নিজেদেরকে গড়ে তুলতে শুধু ব্যর্থ নন, গড়ে তোলার ইচ্ছাও তাদের কম। নিজেদের এগিয়ে নেয়ার জন্য ন্যূনতম চিন্তা, মানসিকতা, পরিশ্রম কোনোটাই তাদের যথেষ্ট নয়। তারা নিজেদের মিশন-ভিশনে একাগ্র নন।

আবার এই ইসলামিস্টরা নিজেদের সামান্য সফলতায় এত বেশি আবেগাপ্লুত হন যে, সেই সফলতা উদযাপন করতে গিয়ে এমন কিছু করেন, যা অনেক বড় বিপদের কারণ হয়ে ওঠেন। নিজেদের পায়ের নিচের মাটি কতটা শক্ত তাও তারা জানেন না। এ কারণেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তারা পিছিয়ে পড়েন। নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাবলি সম্পর্কেও তারা প্রায়ই অজ্ঞ।

দেশের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় মিডিয়ার মাধ্যমে। মিডিয়া রাতকে দিন, আর দিনকে রাতে পরিণত করে মুহূর্তেই। ইসলামিস্টদের হাতে কয়টা ইলেকট্রোনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া আছে? দুই-তিনটিও না!

অন্য দিকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা দেশের সব মানুষকে তাদের চিন্তাচেতনা, আদর্শের দিকে ধাবিত করতে যতটুকু যোগ্য হওয়া দরকার ততটুকুই অর্জন করেছে। সে জন্যই তারা সফল। তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর ও সক্ষম। তাদের যোগ্যতার অভাবটুকুও তারা লবিং, দলীয় সমর্থন বা অন্য কোনো পন্থায় পূরণ করেন। আর ইসলামপন্থীরা তাদের লক্ষ্য অর্জনে নিজেদের যোগ্যতা, সামর্থ্য বাড়ানোর দিকে এক পা এগোলে দুই পা পিছিয়ে যান। ফলে তারা বছরের পর বছর প্রায় একই জায়গায় অবস্থান করছেন।

তাই প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে সময় দিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করা। দেশ পরিচালনা, দেশের সব সেক্টরেই যেন নিষ্ঠাবান মুসলিমরা জায়গা করে নিতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন। সে অনুযায়ী প্রতিনিয়ত কাজ করা, লেগে থাকা জরুরি। তাদের প্রমাণ দিতে হবে, কেন তারা অন্য যে কারো চেয়ে যোগ্য ও দক্ষ।

আপনার মিডিয়া কাভারেজের জন্য ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন বিকল্প মিডিয়া তৈরি করা। ডিসি, ইউএনও একেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আপনি যাতে অবাধে কাজ করতে পারেন সে জন্য স্থানীয় থানা প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনে সে রকম কর্মকর্তা, কর্মী তৈরি করতে হবে।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার আপনার সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য অনেক বড় ফ্যাক্টর। কারণ জনগণের ওপর তাদের অনেক প্রভাব থাকে। তাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে আপনার কাক্সিক্ষত মতাদর্শের লোকদের আনতে হবে। একইভাবে ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমিক সবই প্রয়োজন। প্রতি বছরই সব সেক্টরে কিছু ইসলামপ্রেমী যুক্ত হচ্ছেন; কিন্তু তারা ব্যক্তিজীবনে ইসলাম মেনে চলাকেই যথেষ্ট মনে করেন, রাষ্ট্রীয় জীবনে নয়। ফলে সম্ভাবনার চেয়ে তাদের অবদান খুবই কম।

সার্বিক বিবেচনায় প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। পরিকল্পিতভাবে লোক তৈরির ইনস্টিটিউশন। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে সফলতা মিলবে ইনশাআল্লাহ। কারণ দেশ চালানোর যোগ্যতা অর্জন না করা পর্যন্ত আল্লাহ আপনাকে সেই ক্ষমতা দেবেন না।

আমরা সে দিনের প্রত্যাশায়, যে দিন দেশের প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টরে ইসলাম অনুসারীরা মুখ্য ভূমিকায় থাকবেন। জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি