বিগত স্বৈরাচারী সরকার প্রশাসনকে সর্বোচ্চ কলুষিত করেছে। জনপ্রশাসনের একটি অংশে ফ্যাসিবাদীদের স্থায়ীভাবে বসিয়ে দিয়ে গেছে। এরা ঘুষ-দুর্নীতি করা বৈধ মনে করে। হাসিনা তাদের আদর্শ শাসক, হাসিনার ফিরে আসার জন্য তারা আগ্রহী। এরা এখন বেশ সঙ্ঘবদ্ধ, তাই প্রশাসন অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আরেকটি অংশ হাসিনার সময়ে টিকে থাকার জন্য ফ্যাসিবাদী চক্রের সাথে সায় দিয়েছে। অন্য দিকে দেশপ্রেমিক সৎ যোগ্য কর্মকর্তারা হয় ওএসডি হয়েছেন না হয় পদোন্নতি না পেয়ে কোণঠাসা হয়েছিলেন। পটপরিবর্তনের পরও পুরনো ফ্যাসিবাদীরাই প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে। আমলাতন্ত্রকে সুষ্ঠু ধারায় ফিরিয়ে আনা ও সক্রিয় করে তোলার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টা খুব একটা কাজে আসছে না।

দীর্ঘ শাসনে হাসিনা ক্রমান্বয়ে প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। দেশ পরিচালনার প্রায় সবক্ষেত্রে আমলাদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। হাসিনাও নিয়ম-কানুনের বাইরে গিয়ে তাদের ক্ষমতায়িত করেছেন। এমনকি দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে যা ব্যবস্থাপনা করা হতো তাও আমলাদের হাতে তুলে দেন। ফলে আমলাতন্ত্র প্রথমত বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এবং পরে সব জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের কারিগর ছিল তারা। তার আগের দুটো নির্বাচনেও তারা হাসিনার সহযোগী হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এই আমলাচক্রকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে প্রশাসন রয়ে গেছে তাদের চক্রের নিয়ন্ত্রণে। পদোন্নতি ও পদায়নে তার গভীর প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।

একই কারণে অন্তর্বর্তী সরকার মসৃণভাবে তার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারছে না। ছোটখাটো ইস্যুতে ক্রমাগত আন্দোলন করে সরকারের সংস্কার ও দৈনন্দিন কাজে বাধা দেয়া হচ্ছে। পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চতর পদে পদোন্নতির প্রস্তাবের পর উসকানি দিয়ে সচিবালয় উত্তপ্ত করা হয়। অথচ মেধা-যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে পদোন্নতি কাম্য হওয়া উচিত ছিল। এর ওপর আন্তঃক্যাডার দ্ব›দ্ব চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বিভিন্ন ক্যাডার দলে দলে বিভক্ত হয়ে রীতিমতো মিছিল-মিটিং শুরু করে। নিজেদের দফতরে কাজকর্ম ছেড়ে শত শত কর্মকর্তা আন্দোলনে নামে। এনবিআরের সংস্কার প্রস্তাব নিয়েও চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়। আমলা বিদ্রোহের ছকও আঁকা হয়। এখন পর্যন্ত পেশাদার যোগ্য কর্মকর্তাদের বড় অংশ কোণঠাসা হয়ে আছে। ঘুষ-দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতা ক্ষেত্রবিশেষে আগের চেয়ে বেড়েছে।

প্রশাসনকে নিয়ে দুটো ইস্যু। প্রথমত, আমলাতন্ত্রকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে হবে। নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করার সাথে যারা জড়িত ছিল এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন, লুটপাট, ঘুষ-দুর্নীতি, মুদ্রাপাচারে যারা ফ্যাসিবাদের দোসর ছিল- অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের শনাক্ত করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, এদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাখলে অন্তর্ঘাতের শঙ্কা থেকে যাবে। তাদের কৃত অপরাধের বিচার করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এই আমলাতন্ত্রে দীর্ঘ মেয়াদে সংস্কারের কার্যকর সূচনা করতে হবে। এনবিআরের সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার সফলতার পরিচয় দিয়েছে। নতুন নিয়মে এনবিআর চললে আশা করা যায়, রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক ফল মিলবে। এভাবে সরকারের পুরো প্রশাসনকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে।