মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাহাড়ি জনপদ বোবারথল। এখানকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে নয়া দিগন্তে গত ২২ আগস্ট একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘উন্নয়নবঞ্চিত বড়লেখার বোবারথল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে যুক্ত ছবিতে দেখা গেছে, একজন বয়স্ক নারীকে দু’জন পুরুষ বাঁশে ঝুড়ি বেঁধে কাঁধে নিয়ে চিকিৎসার জন্য শহরে যাচ্ছেন। দুরবস্থায় সড়ক দিয়ে গাড়ি যাতায়াত করতে না পারায় এ দুর্ভোগ। বর্তমানে এমন দৃশ্য অকল্পনীয় হলেও বোবারথলবাসীর জন্য এটিই বাস্তবতা।

শুধু তাই নয়, অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থায় এখানকার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। কৃষকের বাজারে ফসল নিতে কষ্ট হয়। বোবারথলের মানুষের যাতায়াতের কষ্ট এখানকার জনজীবন রীতিমতো বিষিয়ে তুলছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিংবা সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বোবারথলের মতো দুর্গম পাহাড়ি জনপদের কোনো খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। সেখানকার জনপ্রতিনিধিদেরও এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা রয়েছে বলে মনে হয় না। থাকলে এমন হওয়ার কথা নয়। অথচ সিলেট বিভাগের অন্য দু’টি জেলার মতো মৌলভীবাজারও পর্যটনবান্ধব। এ বিভাগে অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হয়েছে; কিন্তু পর্যটনবান্ধব মৌলভীবাজারের সবুজে ঘেরা নয়নাভিরাম বোবারথল কেন এত অবহেলিত থেকে গেল সত্যি তা বুঝে আসে না।

বোবারথল এলাকাবাসীর একটি বড় সমস্যা সুপেয় পানি। ১২টি গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষের এ জনপদে নেই কোনো গভীর কিংবা অগভীর নলকূপ। ফলে বাধ্য হয়ে ব্যবহার করেন পাহাড়ি ছড়া, ঝরনা ও টিলার নিচে কুয়ার পানি। শুষ্ক মৌসুমে এসব ছড়া শুকিয়ে গেলে পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে চুইয়ে পড়া পানি সংগ্রহ করতে হয়, যেখানে পানি জমতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে। বারোঘরি গ্রামের ইমন আহমদ বলেন, ‘এই পানি খাওয়ার অনুপযোগী হলেও বিকল্প না থাকায় তা রান্না, গোসল ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হয়, ফলে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই প্রায়ই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।’

দুর্গম পাহাড়ি জনপদ থেকে বড়লেখা শহর ১৪ কিলোমিটার দূরে। উল্লিখিত জনপদটির মানুষের চিকিৎসায় নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী। ফলে চিকিৎসাসেবায় ভেষজ চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে হয় এখানকার অধিবাসীদের। এই জনপদের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সরকারের কোনো দৃষ্টি রয়েছে বলেও মনে হয় না।

বাংলাদেশে উন্নয়নবৈষম্য লক্ষণীয় মাত্রায় বিদ্যমান। অঞ্চলভেদে উন্নয়নের তারতম্য ঘটে এ দেশে। শহরে নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হলেও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার উন্নয়নে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের নজর খুব কম পড়ে। উন্নয়নের এ বিভেদরেখা ভেঙে দেয়া বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষকে অবহেলিত ও বঞ্চিত রেখে একটি কল্যাণরাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়। শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকার পূরণে সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ অনুচিত ও অগ্রহণযোগ্য। সঙ্গত কারণে বড়লেখা উপজেলার বোবারথল অঞ্চলের মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবহেলা করতে পারে না।

আমরা মনে করি, মৌলভীবাজারের স্থানীয় প্রশাসন বোবারথল জনপদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সরকারের উর্ধ্বতম কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।