নতুন সরকারের শুরুতে জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ সবসময়ই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বার্তা দিয়েছেন। তিনি সবচেয়ে জোর দিয়ে উচ্চারণ করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা হবে আইনের শাসন। এ ক্ষেত্রে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজে আসবে না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী।
তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে বলেছেন, সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া হবে, জুয়া ও মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বিধিবদ্ধ নিয়মে চলবে। এসব বক্তব্যে জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন আছে। আইনের শাসন না থাকলে নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বেছে বেছে আইন প্রয়োগ করা হলে ক্ষমতার কাছাকাছি যারা থাকেন, তারা দায়মুক্তি পেয়ে যান।
তবে বাস্তবতা হলো, আইনের শাসন কেবল বক্তব্য দিয়ে ঘোষণায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; এর জন্য দরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন যদি দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে না পারে, তাহলে সবচেয়ে আন্তরিক প্রতিশ্রুতিতেও মানুষের আস্থা আসে না। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কঠোরতা দেখানো সহজ; নিজের ঘরের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াই প্রকৃত পরীক্ষার জায়গা। নতুন সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নিজ দলের ক্ষেত্রে আইন ও বিধির সঠিক প্রয়োগ করা।
প্রধানমন্ত্রী ভাষণে বলেছেন, যারা ভোট দিয়েছেন বা দেননি, সবার অধিকার সমান। এই বক্তব্য গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে এই আশ্বাস অর্থহীন হয়ে পড়বে। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; বরং তা জবাবদিহি নিশ্চিত করার অনিবার্য উপাদান।
রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের প্রতি তার আহ্বান মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। কিন্তু বাজারব্যবস্থার অনিয়ম কেবল নৈতিক অনুরোধে নিয়ন্ত্রিত হয় না। প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ। একইভাবে রেলব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর যে পরিকল্পনার কথা তিনি বলেছেন, তা জনদুর্ভোগ কমাতে সহায়ক হতে পারে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।
নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ আশাবাদের দরজা খুলেছে। এখন প্রয়োজন কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য। দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, নিরপেক্ষ দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা, এই তিন ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি হতে হবে। তখনই প্রমাণ হবে, আইনের শাসনের অঙ্গীকার কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, একটি বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা।