বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে হাজারো নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়। নেত্রকোনার কেন্দুয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে কেন্দুয়ায় খাল-নদী আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। একসময় যে জলাধার ছিল এই এলাকার প্রাণ, জীবিকা ও পরিবেশের প্রধান ভিত্তি, সেসব খাল-নদী এখন নাব্যসঙ্কট, দখল ও দূষণের ত্রিমুখী আঘাতে ধুঁকছে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও সেতু নির্মাণে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। এ সঙ্কট শুধু পরিবেশগত নয়; এটি অর্থনীতি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

বছরের পর বছর খনন না করায় খাল-নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পলি জমে পানিপ্রবাহ কমে এসেছে। কোথাও খাল প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। এতে বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। শুকনো মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র পানিসঙ্কট। কৃষি উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কমে যাচ্ছে মৎস্যসম্পদ। অথচ একটি সচল নদী বা খাল পারে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে।

নয়া দিগন্তের খবর— কেন্দুয়া উপজেলায় চারটি নদী ও ১৩টি খাল আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— বাউরী, পাতকুরা, সাতা ও বেতাই। এসব খাল-নদীতে পানিপ্রবাহ নেই বললেই চলে। কোথাও হাঁটুপানি। অনেক জায়গায় শুকিয়ে গিয়ে সমতল জমিতে পরিণত হয়েছে। কোথাও ধান ও সবজির আবাদ হচ্ছে। কোথাও বা গবাদিপশু চরছে নদীর বুকে, শিশুরা খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করছে। অথচ কয়েক দশক আগেও এসব নদী ও খালে সারা বছর পানি প্রবাহিত হতো, পাওয়া যেত প্রচুর মাছ।

প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলে খাল-নদীতীর ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। অনেক স্থানে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মাটি ভরাট করে স্থায়ী স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রশাসনের চোখের সামনে এমন দখলদারিত্ব চলতে থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, এমনকি শিল্পবর্জ্য নির্বিচারে খাল-নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে পানির গুণগত মান ভয়াবহভাবে নষ্ট হচ্ছে। দুর্গন্ধ, রোগ-জীবাণুর বিস্তার এবং প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস— সবমিলিয়ে এটি একটি জনস্বাস্থ্য সঙ্কটে রূপ নিচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবাই এর কুপ্রভাব ভোগ করছেন।

দীর্ঘ দিন ধরে খাল-নদী পুনঃখনন ও দখলমুক্ত করার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অপরিকল্পিত বাঁধ ও সেতু নির্মাণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে নাব্যসঙ্কট তীব্রতর করেছে। অবস্থা এত নাজুক যে, দ্রুত খাল-নদী পুনঃখনন, দখলমুক্ত করা এবং দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কেন্দুয়ার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো অল্প সময়ের মধ্যে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে। কেন্দুয়ার খাল-নদী বাঁচলে বাঁচবে এ এলাকার পরিবেশ ও অর্থনীতি। সঙ্গত কারণে এলাকার প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচাতে সময় থাকতে কথার চেয়ে কাজে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ খাল-নদী ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের সম্পদ, যা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন খাল-নদী জরুরি ভিত্তিতে খনন ও পুনরুদ্ধার করা, অবৈধ দখল উচ্ছেদে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সময়োপযোগী কার্যকর নীতির প্রয়োগ করা। একই সাথে দরকার জনসচেতনতা বাড়ানো ও স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া।