ভারত বহু ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির দেশ হলেও সংখ্যালঘু মুসলমানরা দেশটিতে সবসময় নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। আর এসব ব্যাপক হারে বেড়েছে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির শাসনে। দেশটিতে মুসলমানরা নিজেদের মতো করে ধর্ম পালন করতে পারে না। বাড়িতে গরুর গোশত রাখার অপরাধে তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বুলডোজার দিয়ে মুসলমানদের বাড়িঘর ভেঙে দেয়া হয়। একের পর এক মসজিদ ভেঙে মন্দির তৈরি করা হচ্ছে। এনআরসির নামে ভারত থেকে মুসলিম তাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই যখন অবস্থা তখন নরেন্দ্র মোদি সরকার দেশটির মুসলমানদের সম্পদ দখলের জন্য ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল নামে নতুন আইন করেছে।
ওয়াকফ ইসলামের একটি প্রাচীন দানের ব্যবস্থা। কোনো সম্পত্তি এর মালিক নিজের মালিকানা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে জনকল্যাণের জন্য উৎসর্গ করলে তাকে ওয়াকফ সম্পত্তি বলা হয়। ওয়াকফের বিষয়ে ইসলামের সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
ভারতের নতুন ওয়াকফ আইনের মাধ্যমে ওয়াকফ বোর্ডে মুসলমানদের সাথে অমুসলিমদেরকেও রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে বোর্ডে মুসলমানদের ক্ষমতা খর্ব হবে। এখানে একটি প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয় যে, ভারতে যেখানে অন্যান্য ধর্মীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো চালায় শুধু সে ধর্মেরই লোকজন, সেখানে ওয়াকফ বোর্ডে কেন অমুসলিমদের রাখা হবে? কোনো মন্দির পরিচালনা কমিটিতে কি হিন্দুদের সাথে মুসলিমদের রাখা হয়?
ভারতের ওয়াকফ সম্পত্তির অধিকাংশই ব্যবহার করা হয় মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান ও এতিমখানার মতো জনকল্যাণমূলক কাজে। বহু সম্পত্তিই একসময় মৌখিকভাবে বা কাগজপত্র ছাড়াই ওয়াকফ হিসেবে দান করা হয়েছিল। অনেক ওয়াকফ সম্পত্তিরই লিখিত আইনি নথি নেই, যেগুলো কয়েক দশক, এমনকি শত শত বছর আগের। নতুন ওয়াকফ আইনের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল।
বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী যথার্থই বলেছেন, ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল মুসলিমদের কোণঠাসা করার এবং তাদের ব্যক্তিগত আইন ও সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেয়ার হাতিয়ার। বিজেপি ও তার মিত্ররা এখন মুসলিমদের নিশানা করছে; কিন্তু ভবিষ্যতে এটি অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে।
ভারতীয় মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ওয়াকফ আইনকে বৈষম্যমূলক, সাম্প্রদায়িকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মুসলিম নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে।
ইতোমধ্যে ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করা হয়েছে। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাভেদ ও এআইএমআইএমের এমপি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে পৃথক আবেদন পেশ করেছেন। আবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াকফ বোর্ড ও কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে ওয়াকফ সংস্থাগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতে অমুসলিম সদস্যদের বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুুক্তির বিধান ধর্মীয় শাসনে একটি অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ।
ভারতের ওয়াকফ বোর্ডের সম্পত্তিতে জটিলতা থাকলে তা প্রচলিত আইনে সমাধানযোগ্য। তা না করে যেভাবে সংসদে ওয়াকফ বিলের সংশোধনী পাস করা হয়েছে তা মূলত মুসলমানদের সম্পত্তি দখলের নতুন ফন্দি বলে আমরা মনে করি। আমরা এ আইনের তীব্র নিন্দা জানাই।
ভারতের উচ্চ আদালত দেশটির সংখ্যালঘু মুসলমানদের সম্পদ রক্ষায় ও ধর্মীয় বিধান পালনের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানিয়ে এই আইন বাতিল ঘোষণা করবে- এমনটিই প্রত্যাশা।