নরকের একটি পুরনো রসালো কৌতুক দিয়ে শুরু করা যায়। বিভিন্ন দেশের পাপীদের আটকে রাখার জন্য ‘নরকে’ আলাদা ডেগ বা কড়াই ছিল। সব দেশের কড়াইয়ের ওপর ভারী ঢাকনা ছিল। সেখানে কড়া পাহারাদারও রাখা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালিদের কড়াই ছিল একেবারেই খোলা। সেখানে কোনো ঢাকনা ছিল না। পাহারারও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এক লোক কৌতূহলী হয়ে যমদূতকে কারণ জিজ্ঞেস করল। সে জানতে চাইল, এরা তো অনায়াসে এক লাফে পালিয়ে যাবে। যমদূত মুচকি হেসে বললেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওটা বাঙালিদের কড়াই। ওখান থেকে কেউ একজন কিনারায় উঠতে গেলেই নিচের চারজন তার পা ধরে টেনে নামিয়ে আনবে।
জ্ঞানচর্চার চেয়ে অন্যের পেছনে লাগা আমাদের স্বভাব। পরশ্রীকাতরতা আর সুযোগ বুঝে ল্যাং মারাই যেন আমাদের প্রিয় জাতীয় বিনোদন।
বিশ্বখ্যাত ভারতীয় নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলে একসময় বলেছিলেন, বাঙালি আজ যা ভাবে, সমগ্র ভারত তা ভাবে আগামীকাল। এই উক্তি একসময় বাস্তব সত্য ছিল। ১৭৭২ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতাই ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। সেই সময় চিন্তা, সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র ছিল বাংলা। কিন্তু আজ সেই অগ্রগামী বাঙালি কোথায় হারিয়ে গেল?
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, বাংলা ও বাঙালি আন্দোলনপ্রিয় জাতি। আন্দোলনের প্রবল ঠেলায় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে ১৯১২ সালে দিল্লিতে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। তখন থেকেই বাংলার ঐতিহাসিক পতনের সূচনা ঘটে। ১৯১১ সালের এই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহকে বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট দার্শনিক ও কবি আল্লামা ইকবাল গভীর শ্লেষে দেখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘পা গায়া বাবু আপনা জুতা, ছিন লি গায়ি উসকি পাগড়ি।’ এর সহজ অর্থ হলো— বাবু তার হারানো জুতো ফেরত পেল; কিন্তু তার মাথার পাগড়িটা ছিনিয়ে নেয়া হলো। ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গ রদ করে বাঙালিকে সামান্য স্বস্তির জুতো ফেরত দিয়েছিল। কিন্তু রাজদণ্ড ও মর্যাদার পাগড়ি ছিনিয়ে নিয়ে রাজধানী দিল্লিতে সরিয়ে নিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্ত হলো। আমরা পূর্ববঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান পেরিয়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে এলাম। কিন্তু আমাদের আন্দোলনপ্রিয়তার স্বভাব একই রয়ে গেল। আমরা ন্যায়সঙ্গত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করি না। সমাজে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে দিতে রাস্তায় নামি না। আমাদের সব আন্দোলন আটকে থাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে। আমরা শুধু বেতন বাড়ানো আর সুযোগ-সুবিধা আদায়ের সঙ্কীর্ণ দাবিতে ব্যস্ত থাকি।
আমরা সবাই মুখস্থ বলি, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু কাজের বেলায় আমরা বইয়ের ধারে কাছেও যাই না। বাঙালি সমাজ আজ আলো ও অন্ধকারের মৌলিক পার্থক্য বুঝতে চায় না।
বিশ্বের পাঠাভ্যাসের পরিসংখ্যান দেখলে লজ্জা লাগে। একজন আমেরিকান নাগরিক বছরে গড়ে প্রায় ১৭টি বই পড়েন। একজন ভারতীয় নাগরিক বছরে পড়েন ১৫টি বই। সেখানে আমাদের পড়ার টেবিল ধুলোবালি পড়ে, শূন্য পড়ে থাকে। বই না পড়ার কারণে আমাদের সমাজে গভীর চিন্তার আকাল দেখা দিয়েছে। নিজের মেধা ও দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা আমরা করি না। পাশের বাড়ির মানুষের হাঁড়ির খবর নিতে আমরা বেশি পছন্দ করি। সহকর্মীর খুঁত ধরে আড্ডা জমাতেই আমাদের পরম আনন্দ।
বিদেশী নির্বাহীরা যখন আমাদের দেশে শীর্ষ পদে কাজ করেন, তখন কিছু করুণ সত্য প্রকাশ পায়। চাকরিতে ঢুকেই দুই বা তিন বছরের মাথায় সিইও হওয়ার স্বপ্ন দেখা হয়। কাজের টেবিলে মনোযোগ থাকে না। ব্যক্তিগত আড্ডা, চাটুকারিতা আর পরনিন্দায় সময় নষ্ট হয়।
পেশাগত অঙ্গনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো চেইন অব কমান্ড না মানা। নিয়ম ও শৃঙ্খলার প্রতি আমাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই। ধাপে ধাপে কাজ না করে সবাই ক্ষমতার শর্টকাট খোঁজে। প্রত্যেকে অদৃশ্য লবিং করে দ্রুত সফল হতে চায়।
আন্তর্জাতিক করপোরেট অঙ্গনে একটি অপ্রিয় কথা প্রচলিত আছে। বলা হয়ে থাকে, বাঙালি কর্মী বা কর্মকর্তা ধরে রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এই ব্যয়ের কারণ কোনো আকাশছোঁয়া বেতন নয়। এর কারণ তাদের অতিরিক্ত চালাকি, ঘনঘন চাকরি বদলের স্বভাব, প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং আস্থার চরম অভাব। নিয়ম না মানার এই রোগ আমাদের বৈশ্বিক মানে পিছিয়ে দিচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীরা এই কাঁকড়া মানসিকতাকে জিরো-সাম বায়াস বলে থাকেন। আমরা অবচেতনভাবে মনে করি পৃথিবীতে সুযোগ খুব সীমিত। পাশের মানুষ সফল হলে আমার সুযোগ কমে গেল। এই ভুল ও হীন ধারণা থেকে ঈর্ষা জন্ম নেয়। অন্যকে টেনে নামানোর কুৎসিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
বাঙালির রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব দেখলে এক মর্মান্তিক দৃশ্য ফুটে ওঠে। আমরা নিজেদের ভাইকে বিশ্বাস করি না। কিন্তু বিদেশী প্রভুর দাসত্ব করতে মরিয়া হয়ে উঠি। ব্রিটিশ আমলে আমরা নিজেদের ভাইদের ল্যাং মেরে ব্রিটিশদের তোষামোদ করেছি। পাকিস্তান আমলে তাদের শোষণের সহযোগী হয়েছি। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতার পরেও এই দাসত্ব কাটেনি। স্বার্থান্বেষী মহল প্রতিবেশী দেশের আধিপত্যের নিচে নিজেদের সঁপে দিয়েছে। আত্মমর্যাদা নিয়ে রাষ্ট্র গড়ার চেয়ে তাঁবেদারি করতেই আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
শুধু ডিগ্রির সনদ কখনো জাতির মেরুদণ্ড হতে পারে না। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মূল মেরুদণ্ড হলো প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও কার্যকর চেইন অব কমান্ড। আমাদের সমাজে শৃঙ্খলাবোধ খুবই দুর্বল। সবাই হুকুম দিতে চায়, কিন্তু কেউ হুকুম মানতে চায় না। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
বাঙালিকে এক ছাতার নিচে রাখা ইতিহাসের এক জটিল ধাঁধা। কোনো বড় সঙ্কট এলে আমরা ঠিকই এক হই। ১৯৭১ সালে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা এনেছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই দেশ গড়ার কাজ ফেলে লুটপাট শুরু হলো। ক্ষমতার নোংরা কোন্দলে জড়িয়ে পড়ল সবাই। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় রক্তক্ষয়ী পটপরিবর্তন ঘটল।
সুদীর্ঘ সময় পর ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লব ঘটল। গোটা জাতি আবারো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নামল। স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ভোর এলো।
কিন্তু বিপ্লবের রেশ কাটতে না কাটতেই আমরা চেনা রূপে ফিরলাম। মনে হয়, ঐক্যের শক্তি দিয়ে সরকার পতন ঘটানো পর্যন্তই আমাদের দৌড়। দেশ গড়া, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা এক হতে পারি না। তা সে রাজনীতিবিদ, শিক্ষক কিংবা বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্র হোক।
ব্যক্তিগত আখের গোছানো ও ভাগ-বাটোয়ারার কারণে দেশপ্রেম পেছনে চলে যায়। কেউ নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কিছু করতে গেলে চারপাশ থেকে অদৃশ্য বাধা ধেয়ে আসে। নিজের মেরুদণ্ড শক্ত করার সাধনা কেউ করে না। কিন্তু অন্যের মেরুদণ্ড বাঁকা করতে সবাই একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে!
ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার মূল কথা ছিল আত্মশুদ্ধি ও ভ্রাতৃত্ব। সেখানেও আমরা দল ও তরিকার অজস্র দেয়াল তুলেছি। হীনম্মন্যতার কারণে নিজে বড় না হয়ে অন্যকে ছোট করতে ব্যতিব্যস্ত।
সেন্টমার্টিনের নীল সাগরে একঝাঁক মাছ সাঁতরে যাচ্ছিল। সাগরে নোঙর করা নৌবাহিনীর এক বড় যুদ্ধজাহাজ দেখে ছোট মাছেরা আবদার করল, ‘মা, আমরা জাহাজের ভিতরে থাকতে চাই!’
মা মাছটি সন্তানকে নিরাপদে প্রবাল প্রাচীরে ফিরিয়ে নিলো। তারপর মৃদু স্বরে এক চরম সত্য উচ্চারণ করল : ‘The ship is the place for the selfish, And not for the fish.’
অথচ আমরা বাঙালিরা, আজও সেই স্বার্থের জাহাজেই ঘর বেঁধে আছি।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি