পুঁজিবাজারের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে সংশয়

নির্বিকার দুই নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দেশের পুঁজিবাজারের ঘুরে দাঁড়ানো কি আর হচ্ছে না? প্রশ্নটা উঠেছে, কারণ প্রতিদিনই অবনতি ঘটছে সূচকের। একই সাথে দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে বাজারগুলোর লেনদেনও। গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেন নেমে এসেছে ৫০০ কোটির ঘরে। অন্য দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার গতকাল লেনদেন নিষ্পত্তি করেছে মাত্র ৪ কোটি টাকা যা, বাজারটির সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন লেনদেন। দুই শেয়ারবাজারের লেনদেনের পরিমাণ যে বার্তা দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা ক্রমান্বয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

প্রসঙ্গত মাত্র কিছুদিন আগেও প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন ছিল এক হাজার ৬০০ কোটির ওপরে। অপর দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ক’দিন আগেও ১০০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই পাল্টে যায় বাজারচিত্র। আগস্ট মাসের শুরু থেকেই টানা নেতিবাচক প্রবণতা ভর করে পুঁজিবাজারে। প্রতিদিনই কমবেশি সূচক হারাতে থাকে বাজারগুলো। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাজারের পতন আরো তীব্র আকার ধারণ করে। এ কয় দিনে ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটির অবনতি ঘটে ৩০০ পয়েন্টের বেশি। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের সার্বিক মূল্যসূচকের অবনতি ৫০০ পয়েন্ট ছাড়িয়ে যায়।

শুরুতে সংশ্লিষ্ট সবাই বাজারের এ আচরণকে সংশোধন হিসাবে মনে করলেও এখন তাদের কাছে এর সুস্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা নেই। তবে তারা মনে করেন, দেশের সর্বিক অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে যে স্থবিরতা চলছে তারই প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের ম্যাক্রো অর্থনীতি ভালো না থাকলে পুঁজিবাজার ভালো পারফর্ম করতে পারে না এটাই স্বাভাবিক। তার মতে এর বাইরেও কিছু কিছু বিষয় রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মাঝে কমবেশি হতাশা সৃষ্টি করেছে। তিনি আশ^স্ত করেন শিগগিরই সার্বিক বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সব স্টেকহোল্ডারদের সাথে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেয়া হবে যাতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ পরিস্থিতির উত্তরন ঘটানো যায়।

অন্য দিকে বাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি অংশ মনে করেন, সম্প্রতি ডিএসইতে নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতি নিয়ে কিছু ঘটনা ঘটেছে যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ নিয়ে তদন্ত কমিঠিও গঠন করেছে যাতে পুঁজিবাজারের প্রাইমারি রেগুলেটরের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে। অপর দিকে পুনর্গঠিত কমিশন কর্তৃক দেয়া বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তারা মনে করেন, উভয় নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্টিকরণ করা হলেও খুব বেশি সংবেদনশীল হওয়ার কারণে এসব বিষয় পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করছে। ফলে নতুন করে আস্থাহীনতার কবলে পড়ছে পুঁজিবাজার। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেনের অবনতিই তার প্রমাণ বলে মনে করেন তারা। অথচ তাদের ভাষায় আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দুই নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষই রয়েছে নির্বিকার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল সূচকের মিশ্র আচরণ থাকলেও চট্টগ্রাম স্টকে আগের দিনগুলোর মতো সব সূচকের বড় পতন ঘটে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট হ্রাস পায়। ৫ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে স্থির হয় ৫ হাজার ৬৪০ দশমিক ০৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটি ৪ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট কমলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকটি ২ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই), সার্বিক মূল্যসূচক ৯৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয় গতকাল। গতকাল সকালে ১৫ হাজার ২৫৫ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকালে লেনদেন শেষে নেমে আসে ১৫ হাজার ১৬১ দশমিক ৫৭ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৪৫ দশমিক ৫৪ ও ৫২ দশমিক ৮২ পয়েন্ট।

গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। ২৫ কোটি ২৯ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৮৪ লাখ ৯৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৩ কোটি ১৩ লাখ টাকায় ৭২ লাখ ৪৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সায়হাম টেক্সটাইল ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, রানার অটোমোবাইলস, এমএল ডাইং, সিটি ব্যাংক, বেক্সিমকো লিমিটেড, লাভেলো আইসক্রিম ও ফার কেমিক্যালস।

এদিন ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল বিবিধ খাতের জিকিউ বলপেন। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে মিউচুয়াল ফান্ড রিলায়েন্স ওয়ান ছিল এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশ কোম্পানির

অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, গোল্ডেন সন, ক্রাউন্ট সিমেন্ট, সিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড, নিটল ইন্স্যুরেন্স, এস্কয়্যার নিট কম্পোজিট ও স্যালভো কেমিক্যালস।

গতকাল ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটি ১০ শতাংশ দর হারায় গতকাল্। ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিল ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্লোথ ফান্ড। ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সন্ধানি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, তুং হাই নিটিং, ফার্স্ট ফিন্যান্স, ফু ওয়াং ফুডস, প্রাইম টেক্সটাইলস, আমরা নেটওয়ার্ক, রানার অটোমোবাইলস ও ফার কেমিক্যালস।