মো: সহিদুল ইসলাম সুমন
ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ২ ডিসেম্বর ২০২৫। দেখতে দেখতে দু’টি বছর পার হয়ে গেল। ২৮ বছর মোটেই কম সময় নয়, একটি পুরো প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সময়। অথচ পেছনের দিকে তাকালে মনে হয়, এই তো সেদিন ১৯৯৭ সাল। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষরণ থামানোর একবুক আশা নিয়ে তৎকালীন সরকার আর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে সই হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক ‘শান্তি চুক্তি’।
চার খণ্ডে বিভক্ত এই চুক্তির পর তখন মনে হয়েছিল, পাহাড়ের বুকে চেপে বসা পাথরটা হয়তো এবার সরবে। কিন্তু আজ, এই ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে যখন পেছনে তাকাই, মনে প্রশ্ন জাগে, পাহাড় কি আসলেই শান্ত হয়েছে? নাকি সেই সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জমে আছে বারুদের গন্ধ আর দীর্ঘশ্বাসের বাষ্প? চুক্তি হয়েছিল ঠিকই, কাগজের পাতায় সই-সাবুদও পাকা; কিন্তু পাহাড়ের সাধারণ মানুষের বুকের ভেতর যে অস্থিরতা, সেটি কি বিন্দুমাত্র কমেছে? আজ চুক্তির ২৮ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার আর সুযোগ নেই।
চুক্তির পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে একটি ধোঁয়াশা চোখে পড়ে। কাগজে-কলমে হিসাব বেশ পরিষ্কার। চুক্তির চারটি খণ্ড- ক, খ, গ আর ঘ। সব মিলিয়ে ৭২টি ধারা। সরকারি খাতা বলছে, এই ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি নাকি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। শুনলে মনে হবে, বাহ! বেশ তো অগ্রগতি! ৪৮টি ধারা মানে অর্ধেকেরও বেশি কাজ শেষ। এই হিসাবে আরো দেখা যায়, ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে আর বাকি ৯টি ধারার কাজ চলছে। সরকারের বিভিন্ন সূত্র তো বেশ জোর দিয়েই বলছে, ক খণ্ডের ১ থেকে ৪ নম্বর ধারার সবকটিই বাস্তবায়িত। খ খণ্ডের বিশাল তালিকা ১, ২, ৩, ৫ থেকে শুরু করে একদম ৩৩ পর্যন্ত অধিকাংশ ধারাই আলোর মুখ দেখেছে। একইভাবে গ খণ্ডের ১, ৭, ৮, ৯, ১০, ১২, ১৪ এবং ঘ খণ্ডের ১৯টি ধারার মধ্যে ১১টিই বাস্তবায়িত। এই তালিকার দিকে তাকালে যে কেউ ভাববে, পাহাড়ে তো এখন স্বর্গ নেমে আসার কথা। ১৯৯৮ সালে এই চুক্তির ফসল হিসেবেই তো পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিষয়ক মন্ত্রণালয় তৈরি হলো। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় মাইলফলক ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, মাইলফলক ছুঁয়েই যদি আমরা দাঁড়িয়ে থাকি, গন্তব্যে আর না পৌঁছাই, তাহলে সেই মাইলফলকের সার্থকতা কতটুকু? সরকারি ফাইলের এই ৪৮টি ‘সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত’ ধারার সুফল কি পাহাড়ের বসবাসরত সাধারণ মানুষ-পাহাড়ি কিংবা বাঙালিরা আদৌ পাচ্ছে?
সবচেয়ে পীড়াদায়ক বিষয় হলো ভূমি বিরোধ। কার জমি কে দখল করল, কে কাকে উচ্ছেদ করল এই নিয়েই তো যত মারামারি, কাটাকাটি। শান্তি চুক্তিতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়। ওই কমিশনকে আইনি কাঠামো দেয়ার জন্য ১৭ জুলাই ২০০১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ প্রণয়ন করা হয়। ২০০১ সালের প্রণীত আইনে উল্লিখিত ‘চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে’ শব্দগুলোর পরিবর্তে, ২০১৬-এর সংশোধনীতে ‘চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের গৃহীত সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত করা হয়। এর ফলে চেয়ারম্যানের বিচারিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্তকে অবদমিত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতি সদস্যের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হওয়ার মতো অযৌক্তিক আইন সন্নিবেশিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে ৯ জন সদস্যের মধ্যে সাতজন উপজাতি এবং দু’জন সম্ভাব্য বাঙালি। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি হলেও কমিশনে পার্বত্য জেলায় বসবাসরত বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব নেই। সংশোধনী অনুযায়ী চেয়ারম্যানসহ কমিশনের সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কমিশনের গৃহীত সিদ্ধান্ত হবে বিধায় উপজাতি সদস্যদের মতামতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। ফলে বাঙালিদের ন্যায্য দাবির পক্ষে সিদ্ধান্ত পাওয়াও অসম্ভব হবে এবং বাঙালিদের উচ্ছেদের হুমকিসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/স্থাপনা উচ্ছেদের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এছাড়াও, জমি-সংক্রান্ত বেশির ভাগ বিরোধের সাথে বাঙালি জনগোষ্ঠী জড়িত থাকলেও কমিশনে কোনো বাঙালি প্রতিনিধি নেই। শান্তি চুক্তির আগে অনেক উপজাতি ভারতে যাওয়ার আগে তাদের জায়গাজমি বাঙালিদের কাছে বিক্রি করে যায়। শান্তি চুক্তির পর তারা ফিরে আসে এবং বিভিন্ন মহলের ইন্ধনে সরকারি খাস জমিসহ তাদের বিক্রি করা জমিও অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের বলে দাবি করে।
এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে এবং কমিশন কর্তৃক নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ওই কমিশনে বাঙালি প্রতিনিধির উপস্থিতি প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনার অন্যতম অংশীদার জেলা প্রশাসকদেরকে ওই কমিশনের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণত তিন শ্রেণীর জমি রয়েছে। যেমন- ব্যক্তি মালিকানা, সরকারি খাস জমি ও বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চল। স্থানীয় উপজাতি স¤প্রদায়ের লোকজন/নেতারা সরকারি খাসজমি ও বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভূমিসহ সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিজেদের ভূমি বলে মনে করে এবং এ লক্ষ্যে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি (ঈঁংঃড়সধৎু খধংি) অনুযায়ী ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি প্রত্যাশা করে; যা বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি আইন ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনজন সার্কেল চিফ পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯০০ অনুযায়ী সরকারের ভূমি রাজস্ব আদায় করার জন্য নিযুক্ত হলেও সময়ের পরিক্রমায় তারা নিজেদের কথিত ‘রাজা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ভূমি সমস্যার সমাধান হলে সার্কেল চিফদের এ ধরনের প্রভাব- প্রতিপত্তি খর্ব হওয়ার আশঙ্কা থেকে তারাও ভূমি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানে আগ্রহী নয়।
ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০১৬ জারি হওয়ার পর বিচারপতি (অব:) মো: আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখ হতে ৪৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরোধপূর্ণ ভূমির ব্যাপারে দরখাস্ত আহ্বান করেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে সময়ের বাধ্যবাধকতা রহিত করা হয়। অদ্যাবধি কমিশন বরাবর মোট ২২ হাজার ৯৭০টি (খাগড়াছড়ি সাত হাজার ৯০৮, রাঙ্গামাটি ৯ হাজার ৯২৪ ও বান্দরবান পাঁচ হাজার ১৫৮) আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৫৭৪ জন বাঙালি এবং অবশিষ্ট ২২ হাজার ৩৯৬ জন, এর সবাই উপজাতি। উপজাতিদের অভিযোগ/আবেদন সাড়ে ৯৭ শতাংশ ও বাঙালিদের মাত্র আড়াই শতাংশ। উল্লেখ্য, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ ও পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার কারণে প্রায় এক লাখ লোক ভারতে চলে যায়, যাদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক পরিবার বাঙালিদের কাছে তাদের বসতভিটা ও জমি বিক্রয় করে দিয়ে যায়। শান্তি চুক্তির পরে তারা ফিরে এসে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে গণহারে অভিযোগ/আবেদন করে এবং অন্যদিকে বিদ্যমান কমিশনের উপর বাঙালিদের আস্থা না থাকায় তারা অভিযোগ বা আবেদন করা থেকে বিরত থাকে।
গত ৫ আগস্টের পর পাহাড়ের মানুষও নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। কারণ, পতিত স্বৈরাচারী সরকার গত দেড় যুগে পাহাড় নিয়ে যে রাজনীতি করেছে, তা ছিল মূলত তোষণ আর বিভাজনের রাজনীতি। চুক্তির পর আওয়ামী লীগ সরকার এমন এক নীতি নিয়েছিল, যেখানে মনে হতো, পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে জেএসএসের চাপে পড়ে সরকার ভূমি কমিশন আইন সংশোধন করল। সেই সংশোধনী ছিল একতরফা। ৯ সদস্যের কমিশনে একমাত্র বাঙালি সদস্য ছিলেন চেয়ারম্যান, তার ক্ষমতাও এমনভাবে ছাঁটাই করা হলো, ওই আইনে বাঙালিদের ভূমির অধিকার আদায়ের আর কোনো রাস্তাই খোলা রইল না।
চুক্তির পরবর্তী সময়ে পাহাড়ে শান্তির বদলে আমরা কী দেখলাম? দেখলাম ভাইয়ে-ভাইয়ে সঙ্ঘাত। আগে যেখানে লড়াইটা ছিল অনেকটা সরকার বনাম শান্তিবাহিনীর, চুক্তি পরবর্তী সময়ে সেটি হয়ে দাঁড়াল পাহাড়ের ভেতরের ক্ষমতার লড়াই। গত দেড় যুগে পাহাড়ে নতুন করে ছয়টি সশস্ত্র গ্রুপের জন্ম হয়েছে। এরা কারা? এরা তো আকাশ থেকে পড়েনি। এরা পাহাড়েরই সন্তান; কিন্তু হাতে তাদের অস্ত্র। খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, গুম এমন কোনো অপরাধ নেই যা তারা করছে না। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এদের হাতে জিম্মি। পর্যটকরা পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে মুগ্ধ হয়; কিন্তু তারা জানে না, সন্ধ্যার পর ওই সুন্দর উপত্যকাগুলোতে কেমন ভয়ের রাজত্ব কায়েম হয়। আগে মানুষ বাঘের ভয় পেত, এখন পায় এই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর।
জেএসএসের সাথে সরকার চুক্তি করল শান্তির জন্য, অথচ সেই জেএসএসের বিরুদ্ধেই অভিযোগ, তারা বিভিন্ন অজুহাতে ভূমি কমিশনকে কাজ করতে দেয়নি। তাদের মূল লক্ষ্য যেন ছিল বিরোধ জিইয়ে রাখা। বিরোধ থাকলেই রাজনীতি থাকবে, ফায়দা লোটা যাবে। ফলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। যে কয়টি ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সব কটিই ব্যর্থতার দায় নিয়ে বিদায় নিয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ আগস্ট ২০২৫ ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো: নাজমুল আহসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল হাফিজকে নিয়োগ দিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। তাকে আগামী তিন বছরের জন্য এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
পাহাড়ের এই যে অস্থিতিশীলতা, এর পেছনে মূল কারণ হলো আস্থার সঙ্কট আর সঠিক পরিকল্পনার অভাব। ভূমি বিরোধ মেটাতে হলে সবার আগে যেটি দরকার সেটি হলো সঠিক ভূমি জরিপ। আধুনিক যুগে ড্রোন দিয়ে, স্যাটেলাইট দিয়ে সহজে জরিপ করা যায়। কিন্তু পাহাড়ে আজ পর্যন্ত সঠিক কোনো ভূমি জরিপ হয়নি। কারণ যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়, তারা জরিপ হতে দেয় না। তাই কমিশনকে কার্যকর করতে হলে সবার আগে আইন সংশোধন করতে হবে। তারপর দল-মত নির্বিশেষে জরিপ চালাতে হবে। জরিপের মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ জমির সঠিক অবস্থান আর মালিকানা নির্ধারিত হলেই কেবল সমাধানের পথে হাঁটা সম্ভব।
প্রশাসনের একার পক্ষে পাহাড়ে শান্তি ধরে রাখা সম্ভব নয়, যদি না পাহাড়ের ভেতরের মানুষ, বিশেষ করে বিভিন্ন স¤প্রদায়ের নেতারা আন্তরিক হন। এখানে একটি বড় সমস্যা হলো দোষারোপের সংস্কৃতি। পাহাড়ি নেতারা দোষ দেন বাঙালিদের, বাঙালি নেতারা দোষ দেন পাহাড়িদের, আর সবাই মিলে দোষ দেয় সরকারকে। এই চক্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
চুক্তির যেসব ধারা, বিশেষ করে খ ও গ খণ্ডের ধারাগুলো এখনো ঝুলে আছে, সেগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দরকার। লুকোচুরি খেলে কোনো লাভ নেই। অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু সংস্কারের কথা বলছে, তাই এটিই মোক্ষম সময়। ভূমিসহ অমীমাংসিত সব বিষয় নিয়ে সব স¤প্রদায়ের প্রতিনিধিদের এক টেবিলে বসতে হবে। কাউকে বাদ দিয়ে নয়। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বাঙালি সবার কথা শুনতে হবে। কারণ, পাহাড়টা সবার।
এখানেই আসে সেই দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ। ১৯৯৪ সালে সেখানে যখন বর্ণবাদের অবসান হলো, তখন তো শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে রক্তের নদী বয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু আর ম্যান্ডেলা মিলে এক জাদুকরী ধারণা নিয়ে এলেন- ‘রেইনবো ন্যাশন’ বা রঙধনু জাতি। তারা বললেন, প্রতিশোধ নয়, আমরা গড়ব এক নতুন জাতি যেখানে সব রঙের, সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার থাকবে। তারা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ বা সত্য ও মিটমাট কমিশন গঠন করেছিলেন। আমাদের পাহাড়েও আজ এমন একটি মানসিকতা দরকার। পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস আর শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া কোনো চুক্তিই টিকবে না।
গত ৫ আগস্টের পর আমরা দেখেছি, ছাত্র-জনতা চাইলে অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। পাহাড়েও এখন সেই তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। পুরনো নেতারা যদি ব্যর্থ হন, তবে নতুনদের এগিয়ে আসতে।
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’ এই কথাটা শুধু স্লোগান হয়ে থাকলে চলবে না। এটিকে পাহাড়ের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিতে হবে। তাহলেই আসল শান্তির সূচনা হবে। যে শান্তি আসবে ন্যায়বিচারের হাত ধরে, যে শান্তি আসবে সম-অধিকারের ভিত্তিতে। পাহাড়ের প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে পড়ুক এই বার্তা।
লেখক : কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ