গত কয়েক দিন ধরে প্রথমে এনসিপি ও পরে ইসলামী ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের ওপর জাতীয়তাবাদী যুবদল ও ছাত্রদলের উপর্যুপরি হামলা ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়া দেখে এক দিকে হতাশা ও বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছি। রাজধানীর দু’টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা প্রসঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি অভিযোগ করেছেন, সরকার থেকে বরাদ্দকৃত হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ সেনাবাহিনীকে দেয়া হবে, নাকি সাধারণ ঠিকাদারদের দেয়া হবে; সেই প্রশ্নে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেতাদের সাথে ছাত্রদল-যুবদলের মতবিরোধ থেকে বিরোধের সূত্রপাত। এমন অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে আমাদের জানা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের দিনগুলোতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করেছি, সেই একই দৃশ্য এখন দেখছি কেন? তখন তো সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ছিল না। পরে সেই দুর্ধর্ষ আওয়ামী-ছাত্রলীগ ক্যাডার জনপ্রতিরোধে পরাভূত হয়ে পাালিয়ে গেছে। এত রক্তের বিনিময়ে যে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেলাম তা কি আবার ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে?

আমরা রাজনীতি বলতে নির্বাচন, পার্লামেন্ট, সরকার তথা মন্ত্রিসভা, মন্ত্রী, এমপি, আইনকানুন- এসব বিষয় ভেবে থাকি। কিন্তু রাজনীতি বুঝতে হলে এর বাইরেও আরো কিছু বিষয় জানা দরকার। ১৯৩৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড ডি ল্যাজওয়েলের আলোচিত বই ‘পলিটিক্স : হু গেটস হোয়াট, হোয়েন, হাউ’ প্রকাশিত হলে রাজনীতি অধ্যয়নে এক চমক সৃষ্টি হয়। আমরা সত্তরের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নকালে প্রফেসর ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান বইটির রেফারেন্স দিয়ে রাজনীতিকে সহজবোধ্য করে বুঝিয়ে দিতেন। ছাত্রাবস্থায় বিষয়টি পুরোপুরি না বুঝতে পারলেও যখন কর্মজীবনে সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করি এবং সরকারের উপর মহলের কাছে থেকে কাজ করার সুযোগ পাই; তখন তালুকদার মনিরুজ্জামান স্যারের আলোচনাগুলোর বাস্তবতা আমার কাছে ধরা দিত। এত বছর ধরে দেশে যখন বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতন দেখলাম, ল্যাজওয়েলের বইটির কথা আরো বেশি করে মনে পড়ছে।

সম্প্রতি চার দিকে একধরনের অস্থিরতা দেখে অনেকে বলাবলি করছেন, সবকিছু আগের মতো রয়ে গেছে; শুধু চেয়ারের মানুষগুলো বদলেছে। আগের মতো চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, জুলুম, ঘুষ-দুর্নীতি সমানতালে চলছে। এসব দেখে মনে হচ্ছে- রাজনীতি যেন রাষ্ট্রীয় তথা জনগণের সম্পদ চুরি করা ও ভাগবাটোয়ারার একটি প্রতিযোগিতা। ল্যাজওয়েল আইন, সংবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রাষ্ট্র পরিচালনায় আরো যেসব শক্তির প্রভাব রয়েছে সেগুলোর ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি ক্ষমতা, প্রভাব ও সম্পদের ভাগবাটোয়ারার প্রতি অধিকতর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, রাজনীতিতে কিভাবে সম্পদ, ক্ষমতা, মান-মর্যাদা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, সুযোগ-সুবিধা ও প্রাধিকার- ইত্যাদি বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত্র গ্রহণে প্রভাব ফেলে। তার মতে, এসব বিষয় কে কী কিভাবে কখন পায় সেটি বিশ্লেষণ করা গেলে রাজনীতি সহজে বোধগম্য হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ সঠিকভাবে স্বচ্ছতার সাথে ব্যবহার করা না হলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের সমালোচনা করে। এটিই তাদের কাজ। কিন্তু আবার সেই দলগুলো যখন সরকারে যায়, তখন একই কাজ করে। একইভাবে ভাগবাটোয়ার কাজ চলতে থাকে। এরূপ ক্ষেত্রে রাজনীতি নিয়ে যারা অধ্যয়ন করেন, তাদের দেখার বিষয়- কে বা কারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। কে বা কারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব খাটাচ্ছেন। কে বা কারা সিদ্ধান্ত থেকে লাভবান হচ্ছেন। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সেগুলোর ভার কে বা কারা বহন করছেন।

কয়েক দিন আগে একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতার সাথে কথা হচ্ছিল। প্রসঙ্গত তিনি জানালেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত বিধি-বিধানগুলো প্রণয়ন করে থাকেন বিশ্বের বড় বড় ব্যবসায়ী নেতা ও সংস্থাগুলো। সুতরাং এটি সহজে বোধগম্য, বড় ব্যবসায়ীদের সুবিধা ও স্বার্থরক্ষা করে বিধিবিধানগুলো তৈরি করা হয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্যোগে ১৯৪৫ সালে যখন জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয়; তখন তারা নিজেদের স্বার্থরক্ষা করে সংস্থাটির জন্ম দিয়েছিল। এর বড় প্রমাণ হলো- নিরাপত্তা পরিষদের ‘ভেটো’ ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে সীমিত রাখা। প্রভাবশালী দেশগুলো বিশ্বনেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে সীমিত রাখতে ‘ভেটো’ ক্ষমতা স্থায়ী করে নেয়। সেখানে ন্যায়পরতার ভিত্তিতে দেশগুলোর মধ্যে ‘ভেটো’ ক্ষমতার অংশীদার করা হয়নি। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো- এসব বিশ্বমোড়ল আবার দুর্বল দেশগুলোকে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের সবক দেয়। তাই এটি বলা যেতে পারে, রাজনীতি যতটা না আইনি ও সাংবিধানিক বিষয়, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্টদের পারস্পরিক জটিল সম্পর্ক ও আচরণ।

ল্যাজওয়েল আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করে বলেছেন, প্রতিটি সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালিত হয় একটি অভিজাত শ্রেণী দ্বারা। তাদের মধ্যে আছেন রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। তার মতে, যদিও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব নাগরিকের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ থাকার কথা; কিন্তু বাস্তবে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। যেমন- নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করার কথা; কিন্তু নির্বাচন যদি নীলনকশা ও জালিয়াতির হয়, সে ক্ষেত্রে জনগণের ভোটের কোনো মূল্য থাকে না। উদাহরণস্বরূপ ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের নির্বাচনে জনগণ ভোট দেননি; তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। এখন সেই পতিত নেতা শেখ হাসিনা ও তার দোসররা দাবি করছেন, তারা নাকি নির্বাচিত ছিলেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গ্রুপ থিউরি বলে একটি কথা আছে। এতে বলা হয়েছে- সরকারের ধরন রাজতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী বা গণতান্ত্রিক যা-ই হোক না কেন, আসলে কোনো একক ব্যক্তি বা পুরো জনগণ কখনো সিদ্ধান্ত নেয় না। সব ব্যবস্থায় একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে তার উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলায় হাসাহাসি করে থাকি। বাস্তবে তিনিও একটি গ্রুপ নিয়ে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। বাংলাদেশেও একইভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি চলে থাকে। যারা প্রকাশ্যে কাউকে পরোয়া না করে সাহসের সাথে চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কাজকর্ম করে বেড়ায়, তাদেরও কেউ না কেউ মদদ দেন। যারা টাকা পাচার করেন বা দুর্নীতি করেন, তাদের পেছনেও একটি গোষ্ঠী সক্রিয় থাকে।

ল্যাজওয়েল মনে করেন, রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি কতগুলো উৎস থেকে পাওয়া যায়। এর মধ্যে আছে- সম্পদ, জ্ঞান ও দক্ষতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনমনে সুনাম-সুখ্যাতি, তথ্যপ্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সামরিক বাহিনীর সমর্থন এবং আইনি কর্তৃত্ব। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটির চেয়ে আরেকটির প্রভাব বা গুরুত্ব বেশি হতে পারে। তবে শেষ কথা হচ্ছে- এসবের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, সেটিই বড় কথা।

রাজনীতিতে প্রচার-প্রচারণার গুরুত্ব সবাই কমবেশি জানি। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে রাজনীতিতে গণমাধ্যম মহীরুহ ধারণ করেছে। এখন সহজে একে উপেক্ষা করা যায় না। মিডিয়ার কারণে মুহূর্তে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ঘটে থাকে। আজকের বিশ্বে মিডিয়া টাইকুনরা শুধু বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন না: বরং পুরো বিশ্ববাসীকেও মোহগ্রস্ত করে রেখেছেন। অপপ্রচার, অপসাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতার প্রভাবে মানুষ এখন প্রকৃত সত্য খুঁজে পায় না। এখন রাজনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণে গণমাধ্যম দখল করা একটি বড় রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়। সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশ ও ভারতে এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়।

এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রতীক, ধর্ম, দেশপ্রেম, রাজনৈতিক স্লোগান ও আদর্শের দোহাই দিয়ে রাজনীতিবিদরা তাদের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেন। আমাদের মতে, আরো একটি বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে, তা হলো- উত্তরাধিকারের ঐতিহ্য। ‘রাজার ছেলে রাজা হবেন’ এটিকে কোনো কোনো সমাজ অন্ধভাবে মেনে নেয়, তার যোগ্যতা ও গুণ কতটুকু আছে; সেই বিবেচনা করা হয় না। প্রাগৈতিহাসিকভাবে শুরু হওয়া সেই উত্তরাধিকারের ঐতিহ্য এখনো বিভিন্ন সমাজে চালু আছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

সব রাষ্ট্রে ক্ষুদ্র গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হলেও এরা সবসময় একচ্ছত্র প্রভাবশালী থাকে না। নানা কারণে তার পরিবর্তন হতে পারে। এর মধ্যে একটি বড় কারণ হচ্ছে- একটি সরকারের আশপাশে বিভিন্ন গোষ্ঠী সক্রিয় থাকে। এরা পরস্পরে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। এক গ্রুপ আরেকটিকে হটিয়ে জায়গা করে নেয়। এ জন্য সব রাজনৈতিক দলে বিভিন্ন গ্রুপ লক্ষ করা যায়। এমনকি মন্ত্রিসভায়ও বিভিন্ন গ্রুপ থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্পদ বাটোয়ারায় এরা নিজেদের স্বার্থরক্ষায় কাজ করে। সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি রসিকতা করে আমাকে বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অফিসে নানাদিক থেকে মানব-বিদ্যুতের সংযোগ আছে; কখন যে কোনটিতে শর্ট সার্কিট হয়; তা বলা মুশকিল।’ একইভাবে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, ব্যাংকার ও ঠিকাদারদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা চলে। কে কাকে ল্যাং মেরে ফেলে দেবেন সেই প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রাজনীতি হচ্ছে একটি চলমান প্রক্রিয়া যেখানে দরকষাকষি, নেগোসিয়েশন ও দ্বন্দ্ব হচ্ছে নিত্যদিনের খেলা।

দেশের জন্য কোনো আইন প্রণয়ন বা সরকারের নীতিনির্ধারণে কোনো না কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ নিহিত থাকে। বিনা দরপত্রে কোনো পণ্য বা সেবা ক্রয় করা হবে কি না সে জন্য যে দায়মুক্তি ও অন্যান্য আইন প্রণয়ন করা হয়; সেখানেও কিছু লোকের স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া হয়। এমনকি যুদ্ধ-বিগ্রহ করা হয় অস্ত্র বিক্রি বা সম্পদ লুণ্ঠন বা ঠিকাদারি স্বার্থ সামনে রেখে। আইন, বাজেট বা সংস্কার কার্যক্রম সবকিছুই কোনো না কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার বিষয় সামনে রেখে করা হয়।

ল্যাজওয়েল রাজনীতিতে সম্পদ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ের অবতারণা হরেছেন। সেটি হচ্ছে- প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব ও প্রভাবশালীদের মানসিকতা। মনস্তাত্ত্বিক মিথস্ক্রিয়া রাষ্ট্র পরিচালনা তথা সম্পদ আহরণ ও ক্ষমতা বণ্টনে বিরাট প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। রাজনীতিবিদরা ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা, উচ্চমর্যাদার অভিপ্রায়, নিরাপত্তাহীনতা, দেশ-বিদেশের স্বীকৃতি ও মানসিক স্বস্তির বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। আরেকটি বিষয়ও লক্ষ করা যায়। শীর্ষনেতাদের ব্যক্তিগত ‘ইগো’ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তিবোধকে পরাজিত করে। পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার মধ্যে এই লক্ষণ স্পষ্ট ছিল। এ জন্য বোধ হয় রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণের ভাষ্যে বলা হয়- ‘আমি রাগ-অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব না।’ কিন্তু মন্ত্রীরা শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং সে জন্য শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে, এরূপ দৃষ্টান্ত বিরল। সুতরাং শুধু আইন বা সম্পদের মোহ নয়, ব্যক্তিগত মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। শেখ হাসিনা ‘তার পিতা দেশটা স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন’ বলে বাংলাদেশকে তিনি পৈতৃক সম্পত্তিসম বিবেচনা করতেন।

রাজনীতিতে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিজ দল ক্ষমতায় থাকলে রাজনীতিকরা ক্ষমতা ও সম্পদে ফুলে-ফেঁপে ওঠেন। আর দল ক্ষমতায় না থাকলে বিড়ম্বনা, হয়রানি, মামলা-হামলা নিয়ে কয়েক বছর কাটাতে থাকেন। এ জন্য রাজনীতিকরা জেল-জুলুম সহ্য করেন। সেই সাথে অপেক্ষায় থাকেন কখন কিভাবে প্রতিপক্ষকে হটিয়ে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করবেন।

শেষে বলতে চাই, চব্বিশের বিপ্লবের যে পটভূমি ছিল তাকে বিবেচনায় নিয়ে পুরো জাতির প্রত্যাশা ছিল- জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে দেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারসম্পন্ন একটি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। জনগণ সেই আশা নিয়ে নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল; কিন্তু যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টন, ক্ষমতার সুপ্রয়োগ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আমানতদারিতার পরিচয় কি দিতে পারছেন? ল্যাজওয়েল রাজনীতির যে রূঢ় বাস্তবতা তার বইয়ে তুলে ধরেছেন, আশি বছর পরেও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষণে তার ধারণাগুলো বেশ কার্যকর বলে মনে হয়।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব

ayubmiah@gmail.com