বাংলায় একটি পুরনো কথা আছে- ‘দশে মিলি করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ।’ এ কথার ভেতরে যে দর্শন লুকিয়ে আছে, তা কেবল প্রবাদ নয়; একটি জাতির টিকে থাকার শর্তও বটে। ঐক্য যেখানে থাকে, সেখানে পরাজয়েও গ্লানি থাকে না; আর অনৈক্য যেখানে বাসা বাঁধে, সেখানে বিজয়ও একসময় বিষাদে ভরে ওঠে। সদ্য পেরিয়ে গেল ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। রাষ্ট্রীয় ছুটির সেই দিনে যখন সারা দেশ শহীদদের স্মরণে মুখর হয়েছিল, তখন এই প্রবাদটিকে বড় বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হলো। কারণ যে ঐক্যের বলে দুই বছর আগে অসম্ভবকে সম্ভব করা গিয়েছিল, আজ সেই ঐক্যের ভিত্তিভূমিতেই দেখা দিয়েছে ফাটল।

দুই বছর আগের কথা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সম্মিলিত স্রোত রাজপথে নেমে এসে দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। সে ছিল এক বিস্ময়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ বলে, বিপ্লব কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কীর্তি নয়; বিপ্লব হলো বহু বিচ্ছিন্ন ক্ষোভের এক মোহনায় মিলিত হওয়া। জুলাইও ছিল তা-ই। বাম-ডান, ধর্মীয়-অসাম্প্রদায়িক, জাতীয়তাবাদী-প্রগতিশীল- সব ধারা সে দিন একটি অভিন্ন লক্ষ্যে দাঁড়িয়েছিল। মতাদর্শের দেয়াল সে দিন গুঁড়িয়ে গিয়েছিল একটিমাত্র শব্দের সামনে- মুক্তি। নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তার হাত ধরে এই অভ্যুত্থানকে অনেকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই উত্তরণ পেয়েছে গণতান্ত্রিক পরিণতি। এক অর্থে বলা যায়, জুলাই কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি জাতিকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল- একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন।

কিন্তু বিপ্লবের একটি নির্মম নিয়ম আছে। ঐতিহাসিক ক্রেন ব্রিন্টন তার ‘অ্যানাটমি অব রেভল্যুশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রতিটি বিপ্লবের পরই আসে একটি ‘থার্মিডোরীয়’ পর্ব- যখন বিপ্লবের অংশীদাররা পরস্পরের দিকে মুখ ফেরায়। যে আবেগ শত্রুকে পরাস্ত করেছিল, সেই আবেগই এবার খোঁজে নতুন প্রতিপক্ষ, আর তা খুঁজে পায় নিজেদেরই মধ্যে। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে ইতিহাসের প্রায় সর্বত্র এই চিত্র। বাংলাদেশও যেন সেই পুরনো নাট্যেরই নতুন অঙ্ক মঞ্চস্থ করছে। যে অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সবাই এক হয়েছিল, সেই প্রতিপক্ষ পরাজিত হওয়ার পর ঐক্যের সুতাটি আলগা হয়ে গেছে। আর সেই আলগা সুতার ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে অনৈক্যের রাজনীতি। এই অনৈক্য কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; এটি বিপ্লব-উত্তর রাজনীতির এক চেনা ব্যাধি, যার চিকিৎসা সময়মতো না হলে তা মহামারীর রূপ নেয়।

Clash-6-8

এই অনৈক্যের সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রকাশ ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ আঙিনায়। দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির ঠিক প্রাক্কালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর সংবাদপত্রের পাতা রক্তাক্ত করেছে। কোথাও চেয়ার, কোথাও গাছের ডাল, কোথাও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, আহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো- এসব সংঘর্ষের অনেকটাই ঘটেছে খোদ জুলাই অভ্যুত্থানের স্মরণে আয়োজিত সেমিনার, প্রদর্শনী কিংবা প্ল্যাকার্ড কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ যে দিনটিকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উদযাপন করার কথা, সেই দিনটিই হয়ে উঠল অনৈক্যের উপলক্ষ। এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে!

এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বুক পেতে দিয়েছিল, তারা আজ কেন পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে? উত্তরটি অপ্রিয়; কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই। জুলাইয়ের ঐক্য ছিল ‘নেতিবাচক ঐক্য’-অর্থাৎ কারো বিরুদ্ধে ঐক্য, কারো পক্ষে নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এ ধরনের ঐক্যকে বলা হয় ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্ট কোয়ালিশন’। অভিন্ন শত্রু যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ এই জোট অটুট। শত্রু বিদায় নিলেই শুরু হয় ভাগবাটোয়ারার হিসাব- কে কতটা রক্ত দিলো, কে কতটা কৃতিত্বের দাবিদার, ক্ষমতার ভাগে কার অংশ কত বড়। সেই হিসাব যখন সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন বিজয়ের উঠানেই রক্ত ঝরে। ছাত্ররাজনীতির এই সঙ্ঘাত নিছক দুই সংগঠনের বিরোধ নয়; এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অনৈক্যেরই ছায়া মাত্র, যা ক্যাম্পাসের মাটিতে এসে পড়েছে।

আসলে এই মুহূর্তে অলিখিতভাবে চলছে জুলাইয়ের উত্তরাধিকার নিয়ে এক নীরব প্রতিযোগিতা। প্রতিটি রাজনৈতিক ধারা চায় নিজেকে অভ্যুত্থানের প্রকৃত পতাকাবাহী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে; প্রত্যেকেই দাবি করে জুলাইয়ের চেতনার আসল উত্তরসূরি একমাত্র সে-ই। বর্ষপূর্তির সেমিনার, প্রদর্শনী কিংবা মঞ্চ- এসবই তাই হয়ে ওঠে প্রতীকী দখলের ক্ষেত্র; কে মঞ্চে উঠবে, কার ব্যানার বড়, কার স্লোগান উঁচু- এই তুচ্ছ প্রতিযোগিতা থেকেই জন্ম নেয় বড় সঙ্ঘাত। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো- বিপ্লব কারো একার সম্পত্তি নয়। যে গণ-অভ্যুত্থান লাখো মানুষের সম্মিলিত ত্যাগে গড়ে ওঠে, তার একচ্ছত্র মালিকানা দাবি করা একটি আত্মঘাতী অহঙ্কার। যখন একটি পক্ষ ভাবতে শুরু করে, জুলাই কেবল তারই অর্জন, তখন অন্য অংশীদাররা প্রান্তিক হয়ে পড়ে, আর সেই প্রান্তিকতার ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় বিভেদ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে অর্জন ভাগ করে নেয়াতেই সৌন্দর্য; কৃতিত্বের একচ্ছত্র দাবি বরং বিভাজনেরই বীজ বোনে। জুলাইয়ের প্রকৃত মর্যাদা তাকে ভাগ করে নেয়ায়, দখল করে নেয়ায় নয়।

তবে ব্যাখ্যা আর ন্যায্যতা এক জিনিস নয়। কারণ ব্যাখ্যা করা যায় বলেই কোনো কিছু কাম্য হয়ে যায় না। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির- উভয়েই জুলাই অভ্যুত্থানের গর্বিত অংশীদার। উভয়েই নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারে শপথবদ্ধ। তাদের মধ্যকার এই সঙ্ঘাত তাই একই সাথে অপ্রত্যাশিত এবং অনভিপ্রেত। অপ্রত্যাশিত এই কারণে যে, দুই বছর আগেও কেউ ভাবতে পারেনি এই দুই শক্তি মুখোমুখি দাঁড়াবে। আর অনভিপ্রেত এই কারণে যে, এই সঙ্ঘাত জুলাইয়ের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতারই নামান্তর। এখানে দায় নির্দিষ্ট কোনো একটি পক্ষের নয়; সঙ্ঘাত মাত্রই দ্বিপক্ষীয়- তালি এক হাতে বাজে না। শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যদি ক্ষমতা কিংবা কর্তৃত্বের আসন ভাগাভাগির লড়াই শুরু হয়, তবে সেই বিপ্লবের নৈতিক ভিত্তি ক্ষয়ে যেতে থাকে। ইতিহাস সাক্ষী- বিপ্লব যত না বাইরের শত্রুর হাতে মরে, তার চেয়ে বেশি মরে অভ্যন্তরীণ কলহে।

এখানেই এসে পড়ে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়। ত্রয়োদশ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার এই মুহূর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। বর্ষপূর্তির বাণীতে জাতীয় ঐক্যকে যেকোনো মূল্যে রক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে, স্বৈরাচার ও উগ্রবাদের পুনরুত্থানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। এই বার্তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়; কিন্তু বাণী আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব কমানোই এখন আসল পরীক্ষা। কারণ যেখানে সঙ্ঘাতের সাথে রাজনৈতিক পরিচয়ের সমীকরণ জড়িয়ে থাকে, সেখানে প্রশাসনিক পদক্ষেপে সামান্যতম পক্ষপাতের ছায়া পড়লেও তা ঐক্য নয়, অনৈক্যকেই উসকে দেয়। শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায়ই ঐক্য ও সংযমের ডাক দেন; কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা তারও নিচু সারির নেতাকর্মীর মাঠপর্যায়ের কার্যকলাপে সেই ডাকের প্রতিফলন সবসময় দেখা যায় না। এই ব্যবধান ঘোচানোই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।

সরকারের বয়ান তাই হতে হবে সর্বজনীন- কোনো নির্দিষ্ট দল, গোষ্ঠী কিংবা মতাদর্শের বয়ান নয়, হতে হবে পুরো বাংলাদেশের অভিভাবকের বয়ান। রাষ্ট্র যখন কথা বলে, তখন তার কণ্ঠে দলীয় সুর বেজে উঠলে জনগণ আস্থা হারায়। ন্যায়বিচার তখনই বিশ্বাসযোগ্য, যখন তা হয় অন্ধ, যখন অপরাধীর পরিচয়ের চেয়ে অপরাধের ওজনই বড় বলে বিবেচিত হয়। জবির সংঘর্ষে হোক কিংবা বরিশালের ঘটনায়, ‘দোষী কে’ তার আগে দেখতে হবে ‘দোষ কতটা গুরুতর’ এবং সেই অনুযায়ীই ব্যবস্থা নিতে হবে- নির্বিশেষে, নির্মোহভাবে। বিচারের মানদণ্ড যদি সংগঠনভেদে বদলে যায়, কারো প্রতি নমনীয়তা আর কারো প্রতি কঠোরতা যদি নীতির বদলে পরিচয় দেখে নির্ধারিত হয়, তবে দ্বিমুখী মানদণ্ড জাতিকে আবার সেই পুরনো গর্তেই ফেলে দেবে, যে গর্ত থেকে জুলাইয়ে রক্ত দিয়ে বেরিয়ে আসা হয়েছিল। তাই প্রশাসনকে ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর আনুগত্যের বদলে ন্যায় ও নীতির আনুগত্য করতে হবে; দেশের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ থাকতে হবে। দায়িত্বশীলতার অর্থ কেবল কঠোর হওয়া নয়; দায়িত্বশীলতার প্রকৃত অর্থ ন্যায্য হওয়া।

কেবল প্রশাসন নয়, দায় বর্তায় শিক্ষাঙ্গনের অভিভাবকদের ওপরও। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান ও যুক্তির চর্চাকেন্দ্র; সেখানে যদি চেয়ার আর গাছের ডাল অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে তা কেবল দু’টি সংগঠনের নয়, গোটা শিক্ষাব্যবস্থার পরাজয়। শিক্ষক, প্রক্টর, প্রশাসন- সবাইকে নিরপেক্ষ অভিভাবকের ভূমিকায় ফিরতে হবে। দীর্ঘদিন ছাত্রসংসদগুলো অকার্যকর থাকায় ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে নেতৃত্বশূন্যতা, আর সেই শূন্যতা পূরণ করছে পেশিশক্তির প্রতিযোগিতা। জাকসু, ডাকসুসহ ছাত্রসংসদগুলোকে কার্যকর করা, নিয়মিত নির্বাচন দেয়া, নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতির সুস্থ পরিসর তৈরি করা- এসবই এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার বৈধ পথ থাকে না, সেখানেই সঙ্ঘাতের অবৈধ পথ প্রশস্ত হয়।

আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অনৈক্যের এই মুহূর্তে দোষারোপের রাজনীতি নতুন করে ডালপালা মেলছে। কেউ বলছেন, এক পক্ষ পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে, কেউ আঙুল তুলছেন তৃতীয় কোনো শক্তির দিকে। এই পারস্পরিক দোষারোপ যত বাড়বে, প্রকৃত সমাধান তত পিছিয়ে যাবে। আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক শক্তি পরিণত হয় না। প্রতিটি পক্ষকে তাই আগে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে, প্রতিপক্ষকে অভিযুক্ত করার আগে নিজের ভূমিকা যাচাই করতে হবে। জুলাইয়ের চেতনা ছিল আত্মজিজ্ঞাসার চেতনা; সেই চেতনা যদি আত্মপ্রবঞ্চনায় রূপ নেয়, তবে অভ্যুত্থানের মর্মবস্তুই হারিয়ে যাবে।

তাহলে পথ কী? পথ একটাই- প্রতিযোগিতা আর সঙ্ঘাতের মধ্যে সীমারেখা টেনে দেয়া। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য অস্বাভাবিক নয়; বরং তা-ই স্বাভাবিক। মতভেদকে শত্রুতায় রূপান্তরিত করাই যত বিপদের মূল। পরিণত গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষকে ‘শত্রু’ নয়, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ভাবা হয়; আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মীমাংসা হয় ভোটের বাক্সে ও যুক্তির টেবিলে, রক্তের রাজপথে নয়। কবি কামিনী রায়ের সেই অমর পঙ্ক্তি- ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই বোধই গণতন্ত্রের প্রাণ। সহনশীলতা দুর্বলতা নয়; বরং তা রাজনৈতিক পরিপক্বতার সর্বোচ্চ প্রকাশ। পেশিশক্তির বদলে যুক্তির শক্তি, দখলের বদলে সংলাপ, প্রতিহিংসার বদলে সহাবস্থান- এই হোক নতুন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির মূলমন্ত্র।

শেষ কথাটি বলি একটু ভিন্ন সুরে। জাতি হিসেবে আমাদের কখনো সাহসের অভাব ছিল না; আমাদের দুর্বলতা ছিল ঐক্য ধরে রাখার ধৈর্যের অভাব। আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনতে জানি; কিন্তু বিজয় ধরে রাখতে হোঁচট খাই। একাত্তরে যে ঐক্যে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, কিংবা নব্বইয়ে যে ঐক্যে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল- তারপরের ইতিহাস আমাদের একই শিক্ষা দিয়েছে। শত্রুকে হারানোর চেয়ে কঠিন বিজয় ধরে রাখা। বিজয়ের পরদিনই যখন বিজয়ীরা পরস্পরকে সন্দেহ করতে শুরু করে, তখন অর্জন হাতছাড়া হতে সময় লাগে না। জুলাইয়ের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে এসে আমাদের সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি থেকে সাবধান হতে হবে।

সে দিন শহীদদের কবরে যে ফুল রাখা হলো, সেই ফুলের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা পাবে তখনই, যখন তাদের রক্তে অর্জিত ঐক্য আমরা রক্ষা করতে পারব। যে ছাত্র-জনতা রাজপথে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল, তাদের কাছে ইতিহাসের দাবি আজও একটাই- হানাহানির উঠোন থেকে সরে এসে আবার সেই ঐক্যের মোহনায় ফিরে আসা। কারণ ঐক্যই ছিল জুলাইয়ের প্রথম শব্দ, আর ঐক্যই হওয়া উচিত জুলাইয়ের শেষ অঙ্গীকার। অনৈক্যের হাত ধরে যে জাতি হাঁটে, ইতিহাস তাকে ক্ষমা করে না; আর ঐক্যের পথে যে জাতি অবিচল থাকে, ভবিষ্যৎ তার জন্যই অপেক্ষা করে।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Mal55ju@yahoo.com