বেলুচিস্তানে জাফর এক্সপ্রেস ট্রেনে হামলা পাকিস্তানের ভৌগোলিক নিরাপত্তা হুমকিকে একেবারে নাঙ্গা করে দিয়েছে। এমনিতে পাকিস্তান সবসময় রাজনৈতিক পীড়ন এবং স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তে থাকা হুমকির মোকাবেলা করে আসছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান ঘটনার পর যেভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং উগ্রবাদী হামলায় পাকিস্তান নামক জাহাজখানি ঘূর্ণাবর্তে ধাক্কা খাচ্ছে, এরকম পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি।
এই প্রথমবার পাকিস্তান মারাত্মক অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পড়ে স্বাভাবিক নিয়মে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো বড় সর্বনাশের মুখোমুখি শুধু নয়, রাজনৈতিক দৃশ্যপটেও জাতি এমন ভয়ানকভাবে বিভক্ত যে, দু’পক্ষ একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কাতারবন্দী হয়ে আছে। তার ওপর আছে দুই প্রদেশ খায়বর পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানের উগ্রবাদী হামলা, যা ২৪ ঘণ্টা কাউকে বিশ্রাম নিতে দেয় না। এটাও প্রথমবার আমরা দেখছি যে, আমাদের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে শত্রু হামলা করতে উন্মুখ। বিশেষ করে আফগানিস্তানের কথা বলতে হয়। দেশটিতে ক্ষমতাসীন তালেবানকে মসনদে পৌঁছাতে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। প্রায় ৫০ বছর তাদের মেজবানি করেছিল। তাদের জন্য পাকিস্তানিরা নিজেদের চক্ষু ও অন্তর ফরাশ হিসেবে বিছিয়ে রেখেছিল। পাকিস্তান তাদের কারণে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থশিকারের যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়েছিল। তার ফলে ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উদ্ভব, কালাশনিকভ ও হেরোইন কালচার, সর্বোপরি অর্থনৈতিক দুরবস্থা আমাদের বেগুনাহ বাসিন্দাদের জীবন পণবন্দী করে ফেলেছিল। আমাদের ৮০ হাজার বিলিয়ন ডলারের ওপর ক্ষতির কারণ হয়েছিল। আফসোস, আমাদের জীবন জীবিকার বহুদিনের অংশীদার সেই আফগান তালেবান ভাইয়েরা আজ আমাদের জাতশত্রুর সাথে মিলে আমাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত মিটিয়ে দিতে তৈরি।
দ্বিতীয়ত, দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছে ‘কওমি সালামতি কমিটি’। সেই কমিটির সভায় বৃহৎ বিরোধী দল পিটিআই নিজে তো অংশ নেয়ইনি, উপরন্তু তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় পাকিস্তানের শত্রুতায় মগ্ন ভারত ও আফগানিস্তানের অবস্থান সমর্থন করছে। এমনকি আফগানিস্তানে কোনো ধরনের অপারেশন চালানোর ব্যাপারে পিটিআই না বলে দেয় এবং তারা ক্ষমতায় এলে ২০০৮ সালের মতো ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়ে দেয়। তবে স্বস্তির ব্যাপার এই যে, অন্য সব রাজনৈতিক দল সেনা অপারেশনে সহমত হওয়ায় ওই ফেতনা নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। আর শুকরিয়া জানাতে হবে যে পিটিআই পরে এ ব্যাপারে ‘প্রজেক্ট ইমরান’ ঘোষণা না করে শুধু আফসোস করে ক্ষান্ত আছে। তবে ইমরান সরকারের আমলে গৃহীত অরাজনৈতিক এবং অবিবেচক পদক্ষেপগুলো দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো শুধু ধ্বংস করেনি, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এমন সব প্রকাশ্য ভুল তারা করে যে, এর ফলে পাকিস্তান বাকি দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে একঘরে হয়ে পড়ে। এসবের মধ্যে সি পেক বন্ধ করা, সৌদি আরবের মতো ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা যুক্ত ছিল। এছাড়া তালেবান কাবুলে ক্ষমতা দখল করার পর তাদের সমর্থন করতে গিয়ে ‘তারা গোলামির জিঞ্জির ছিন্ন করেছে’ মর্মে বয়ান দেয়া হতে থাকে। এরপরে আবার তালেবানকে খায়বর পাখতুনখোয়ায় জায়গা দেয়ার পলিসি পুনরায় উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটিয়ে দেশকে জাহান্নামে দাখিল করার শামিল ছিল। ইমরান খান এসব ক্ষমতার শেষ দিনগুলোতে করেন যখন তিনি অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। সেসময় তিনি ১১-১২টা পুনঃনির্বাচনে পরাজিত হন। এমনকি কেপিতে জেইউআই-র সাথে ভোটের লড়াইয়ে তিনি একই পরিণতি বরণ করেন।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও পরপর পরাজয়ে তার আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জেতার কোনো আশা না থাকায় ইমরান জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে তালেবান এবং টিটিপির সমর্থন হাসিলের চেষ্টা করতে থাকেন। আর ইলেকট্রোনিক ভোটিং মেশিনে ভোট গ্রহণের পক্ষে যতটা সম্ভব প্রচারণা শুরু করেন। এখন অন্ধের মতো পথচলা বা অনুসরণ বাস্তবতা পাল্টে দেবে না। পিটিআইয়ের কওমি সালামতি কমিটি বর্জনে পাকিস্তানের বন্ধুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেবে না। বরং এটা আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে অপরাজনীতি, প্রতিক‚লতা, হঠকারিতা ইত্যাদি বৃদ্ধি করবে। আজ আমরা যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, সেখানে ইতিহাস আমাদের জন্য কিছু সবক লিখে দিয়েছে।
এক. আফগান তালেবান আমাদের সাথে যেসব আচরণ করেছে তা থেকে এ শিক্ষা মেলে যে শুধু ধর্মের বুনিয়াদে অন্য রাষ্ট্রের সাথে কার্যকর সম্পর্ক গড়া যায় না। মনে রাখতে হবে এরা সেই তালেবান যারা ধর্মের কারণে হিন্দুস্তানে নির্যাতিত কিছু মুসলমান আফগানিস্তানে হিজরত করতে চাইলে তারা তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল।
দুই. নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়ে না হয়ে কৃত্রিম উপায়ে বা কোনো বিশেষ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হঠাৎ নেতা হলে তিনি বা তারা কোনো অবস্থায় পরিপক্বতার সাথে রাজনৈতিক বিষয়সমূহ সামাল দিতে পারেন না।
তিন. আমাদের বিরোধী ভারতের সাথে সঙ্ঘাত কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে হবে। প্রতিবেশী দেশটির ব্যাপারে আমাদের গৃহীত পলিসিতে নজর দেয়া ও গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ আমরা সারাক্ষণ নতুন নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারব না। এ মুহূর্তে আমাদের শর্টটার্ম পলিসি নিতে হবে যাতে করে অভ্যন্তরীণ শত্রুদের বিরুদ্ধে শক্ত সামরিক অ্যাকশন নেয়া যেতে পারে। আর ভেতরের ও বাইরের শত্রুদের মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পলিসি তৈরি করতে হবে। প্রতিপক্ষ ভারতের সাথে চীনের মতো ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ এবং রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ব্যাপক সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পাকিস্তানের উর্দু দৈনিক জং-এ ২৮ মার্চ ২০২৫ তারিখে
প্রকাশিত কলাম
অনুবাদ করেছেন এরশাদ আলী