কলকাতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র পার্কসার্কাসে আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু ইতিহাসের গৌড়-মালদহের পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ। হিন্দুত্ববাদীদের মতে, এটি নাকি আদিনাথের মন্দির ছিল। এ দাবি কার্যকর করতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এটি যে মন্দির ছিলÑ তার জন্য দেবদেবীদের মূর্তি বসিয়ে দিয়ে এসেছে কাছাকাছি জায়গায়। যদিও ভারতের প্রত্নতত্ত্ববিদ বিভাগের নোটিশ দেয়া আছে, তার পরও হিন্দুত্ববাদীরা কিভাবে, যেখানে নিরাপত্তা রক্ষীবাহিনী মোতায়েন আছে; সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারল? তবে ওই আলোচনা থেকে আরো একটি কথা উঠে এসেছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় তৈরি করা হয়েছিল লিবারহান কমিশন। তার তোয়াক্কা না করে বিচার বিভাগকে প্রহসনে পরিণত করে বাবরির স্থলে রাম মন্দির তৈরি করা হয়েছে। মুর্শিদাবাদের প্রতিষ্ঠাতা নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর তৈরি করা কাটরা মসজিদও একটি মন্দির ছিল, এই দাবি করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সেখানকার জেলা শাসককে স্মারকলিপি দিয়েছে। আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের একটি মসজিদকেও এভাবে একদা মন্দির ছিল এমন দাবি করে হিন্দুত্ববাদীরা এ ধরনের দাবি যে করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কথাটি নিছক অমূলক নয়। কলকাতার দমদম এয়ারপোর্টের ১৩৬ বছরের মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে গেছে।
এবার আসল ইতিহাসে আসা যাক। বাংলার ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর এক ঐতিহাসিক নিদর্শন হলো আদিনা মসজিদ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার গাজল থানার পাণ্ডুুয়ায় অবস্থিত। পূর্বে এটি ছিল গৌড় মালদহের মধ্যে। এ বিশাল স্থাপত্যটি শুধু বাংলার নয়, তৎকালীন পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ ছিল।
চতুর্দশ শতকে গৌড়বঙ্গের স্বাধীন ইলিয়াস শাহী রাজবংশের দ্বিতীয় সুলতান সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-১৩৯০ সালে) মসজিদটি নির্মাণ করেন। নির্মাণকাজ শুরু হয় আনুমানিক ১৩৬৯ সালে। শেষ হয় ১৩৭৫ সালে।
তৎকালীন গৌড়বঙ্গের রাজধানী পাণ্ডুুয়াকে (ফিরোজাবাদ) সমৃদ্ধ করতে এবং ইলিয়াস শাহী সুলতানদের সার্বভৌম ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে সিকান্দার শাহ রাজকীয় মসজিদটি তৈরি করেছিলেন। দামেশকের বিখ্যাত উমাইয়া মসজিদের নকশা এবং পারস্য ও স্থানীয় বাঙালি স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে এটি নির্মিত হয়। মসজিদটির বিশাল উঠান, বহুমাত্রিক গম্বুজ এবং লাল ইট ও পাথরের কাজ তৎকালীন প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য উদাহরণ।
‘আদিনাথ মন্দির’ দাবির কারণ ও ঐতিহাসিক সত্যতাÑ
সাম্প্রতিক সময়ে একশ্রেণীর মানুষ দাবি করছেন, আদিনা মসজিদ নাকি আগে কোনো ‘আদিনাথ শিব মন্দির’ ছিল। সেটি ভেঙে এ মসজিদ বানানো হয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণের ভিত্তিতে এমন দাবির কোনো সত্যতা নেই। বিষয়টি বোঝার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জানা প্রয়োজনÑ
১. নামের সঠিক উৎস (ভাষাগত অর্থ) : ‘আদিনা’ নামটি কোনো সংস্কৃত বা হিন্দুধর্মীয় শব্দ থেকে আসেনি। এটি একটি বিশুদ্ধ ফারসি শব্দ। ফারসি শব্দ ‘আদিনাহ’-এর অর্থ ‘শুক্রবার’।
ইসলামে জুমার (শুক্রবার) দিনের বিশেষ গুরুত্ব আছে। তাই ফারসি ও ইসলামী সংস্কৃতিতে প্রধান জামে মসজিদকে ‘আদিনা মসজিদ’ (অর্থাৎ জুমার মসজিদ) বলা হতো। অন্যদিকে ‘আদিনাথ’ শব্দটি একটি সংস্কৃত শব্দ, যা প্রধানত শিব বা জৈন তীর্থঙ্করদের নির্দেশ করে। দু’টি শব্দের উচ্চারণ কাছাকাছি মনে হলেও এদের অর্থ ও ভাষার উৎস সম্পূর্ণ আলাদা।
২. নকশা ও স্থাপত্য পরিকল্পনা : আদিনা মসজিদ কোনো ছোট বা মাঝারি আকারের মন্দিরকে সামান্য বদলে তৈরি করা ভবন নয়। এটি একটি সুবিশাল ‘হাইপোস্টাইল’ (অনেক স্তম্ভযুক্ত) প্রাঙ্গণবিশিষ্ট মসজিদ; যার নকশা প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য ও কেন্দ্রীয় এশিয়ার রাজকীয় মসজিদগুলোর মতো। একটি আস্ত মন্দির ভেঙে বা রূপান্তর করে এত বড় নির্দিষ্ট ইসলামী স্থাপত্য তৈরি করা স্থাপত্যবিদ্যার দিক থেকে অসম্ভব।
৩. প্রাচীন পাথরের পুনর্ব্যবহার বা ‘স্পোলিয়া’ : আদিনা মসজিদের ভিত্তি, দেয়াল এবং দরজার কিছু অংশে হিন্দু বা বৌদ্ধধর্মীয় প্রতীকের খোদাই করা পাথর দেখা যায়। এটি দেখে অনেকে মনে করেন, এটি মন্দির ছিল। কিন্তু এর আসল কারণ হলো ‘স্পোলিয়া’ বা পুরনো উপাদানের পুনর্ব্যবহার।
পলিগঠিত সমতল ভূমির দেশ হওয়ায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলায় ভালোমানের শক্ত পাথরের প্রচণ্ড অভাব ছিল। ফলে তৎকালীন স্থপতি ও কারিগরেরা গৌড় ও পাণ্ডুুয়ার আশপাশের পরিত্যক্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন ভবন, প্রাসাদ ও মন্দির থেকে পাথর সংগ্রহ করে নতুন ইমারতের ভিত্তি মজবুত করতে ব্যবহার করতেন।
বহু প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ তাদের গবেষণায় এই ‘স্পোলিয়া’র বিষয়টি স্পষ্ট করে গেছেন। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) প্রথম ডিরেক্টর জেনারেল স্যার অ্যালেকজান্ডার ক্যানিংহাম তার ‘রিপোর্ট অব এ টুর ইন বিহার অ্যান্ড বেঙ্গল ইন ১৮৭৯-৮০’ (ভলিউম-১৫)-এ গৌড় ও পাণ্ডুুয়ার ঐতিহাসিক স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি এবং পরে প্রত্নতত্ত্ববিদ জে ডি বেগলার লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) এবং পাণ্ডুয়ার ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে উল্লেখ করেন, আদিনা মসজিদের নিম্নাংশে ও স্তম্ভে ব্যবহৃত ব্যাসাল্ট পাথরগুলো গৌড় ও আশপাশের প্রাচীন পাল ও সেন আমলের পরিত্যক্ত স্থান বা ভবন থেকে সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহার (স্পোলিয়া) করা হয়েছিল।
রিচার্ড এম ইটন তার বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ ‘ দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার, ১২০৪-১৭৬০’ -এ বাংলায় ইসলামী স্থাপত্য নির্মাণের এ বিশেষ কৌশলটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে তৎকালীন সুলতানরা পাথরহীন পলিগঠিত গাঙ্গেয় বদ্বীপে নতুন বিশাল ইমারত তৈরির সময় স্থানান্তরিত প্রাচীন শহরের পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষের পাথর সংগ্রহ করতেন।
পার্সি ব্রাউন তার বিখ্যাত শিল্প ও স্থাপত্য ইতিহাস বই ‘ইন্ডিয়ান আর্কিটেকচার (ইসলামিক পিরিয়োড)’-এ উল্লেখ করেছেন, বাংলায় মধ্যযুগীয় স্থপতিরা প্রধানত ইট দিয়ে ভবন তৈরি করতেন। তবে যেসব জায়গায় বাড়তি শক্তিমত্তা ও স্থায়িত্ব দরকার ছিল (যেমন স্তম্ভ, ভিত্তি বা মেহরাব), সেখানে আশপাশের প্রাচীন ও ভগ্ন রূপান্তরিক ভবন বা মন্দির থেকে ব্যাসাল্ট পাথর সংগ্রহ করে ব্যবহার করতেন।
উল্লিখিত প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকদের লেখাতে কোনো ধরনের মন্দির ভাঙার কথা পাওয়া যায় না। তাহলে বলা বাহুল্যÑনতুন একটি বিশাল ইমারত বানাতে পুরনো ভগ্নাবশেষের পাথর পুনর্ব্যবহার করা আর কোনো দাঁড়িয়ে থাকা আদিনাথ মন্দিরকে ভেঙে মসজিদে রূপান্তর করাÑ এ দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
৪. শিলালিপি ও ঐতিহাসিক দলিল : মসজিদের ভেতরে সিকান্দার শাহের সময়ের নিজস্ব আরবি শিলালিপি আছে; যেখানে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছেÑ সুলতান সিকান্দার শাহ মসজিদটি নির্মাণ করিয়েছেন। এতে নির্মাণের সাল (হিজরি ৭৭৬/১৩৭৪-৭৫ সাল) এবং সুলতানের উপাধি উল্লেখ আছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আদিনা মসজিদ সুলতান সিকান্দার শাহের তৈরি এক ঐতিহাসিক রাজকীয় স্থাপত্য। নির্মাণে আঞ্চলিক ভগ্নাবশেষের পাথর ব্যবহারে এতে কিছু আগের শিল্পকর্মের ছাপ রয়ে গেছে; কিন্তু এটি কোনো ‘আদিনাথ মন্দির’ ভেঙে রূপান্তর করার ফল নয়।
মসজিদটির নির্মাণ স্থাপত্য সম্পর্কে আরো বিশদ জানতে বাংলাপিডিয়াতে ‘আদিনা মসজিদ’ শিরোনামের আর্টিকেলটি পড়া যেতে পারে। সেসব তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, তৎকালীন বাংলার ইলিয়াস শাহী রাজবংশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তাদের প্রশাসনিক উদারতাও চোখে পড়ে। এই রাজবংশের সুলতানরা (যেমন- শাসনামলের প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ও পরবর্তী সুলতানরা) স্থানীয় হিন্দু প্রজা ও সামন্তদের আস্থা অর্জন করে বাংলাকে দিল্লি সালতানাতের হাত থেকে স্বাধীন করেছিলেন। তাদের দরবারে এবং সেনাবাহিনীতে হিন্দু কর্মকর্তা ও সেনাপতিদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। এমনকি তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটেছিল। তাদের এ সহনশীল নীতি ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে তৎকালীন বাংলায় শিল্প ও স্থাপত্যের এমন অভূতপূর্ব জোয়ার এসেছিল। তাই না জেনে ভুল তথ্যে কান না দিয়ে, আমাদের উচিত নিজের বাংলার ঐতিহাসিক আর প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে জানা ও অনুধাবন করা। মানুষ মনে করছেন, আদিনা মসজিদ আরেকটি বাবরি না হয়ে ওঠে।
লেখক : পশ্চিমবাংলার কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি