ড. শেখ আকরাম আলী
আমাদের বিভিন্ন সরকারের আমলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। সূচনালগ্নে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি ভারত ও সোভিয়েত ব্লকের নিয়ন্ত্রণে ছিল। শেখ মুজিব সরকারের পতনের পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্ব পেতে থাকে। সেই সাথে পশ্চিমা ও মুসলিম বিশ্ব এবং চীন ঢাকার ভালো বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে খুব বড় পরিবর্তন না এলেও এরশাদের আমলে ভারতের সাথে সম্পর্ক হৃদ্যতাপূর্ণ ছিল। পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক বিশ্লেষকদের কারো কারো মতে, ভারত ও মার্কিন সমর্থনে এরশাদ ক্ষমতায় আসায় তিনি এই দুই দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সফল হয়েছিলেন; যা অনেকাংশে জিয়াউর রহমানের শুরু করা নীতি অনুসরণ করেছিল।

পরে একই ধারা অব্যাহত ছিল। একানব্বইয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার জিয়ার অনুসৃত নীতি অনুসরণ করে। তবে ভারতের ক্ষেত্রে সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে। কিছুটা টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল। তবু তার পররাষ্ট্রনীতি কখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেনি। এটি একটি পশ্চিমা-বান্ধব ও চীন-বান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির নীতিতে পরিচালিত হয়েছিল। তবে সঙ্কটের সূচনা হয় খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রকে সাথে নিয়ে সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমদের সহযোগিতায় শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতে সক্রিয় হয় ভারত। এতে সফলও হয়।

শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের কথিত ‘স্বর্ণযুগের’ শুরু। দিল্লি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে কার্যত বাংলাদেশকে নিজের সম্পূর্ণ পক্ষপুটে নিয়ে নেয়। একটানা সাড়ে ১৫ বছর বাংলাদেশের ওপর ভারত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। চব্বিশের বর্ষা বিপ্লবে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন হলে এদেশে আপাতত ভারতীয় আধিপত্যের অবসান ঘটেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতীয় হুমকি উপেক্ষা করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা করে। পাকিস্তান ও তুরস্কের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নে যথাযথ মনোযোগ দেয়। উভয় দেশের সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ হতে পারেÑ এই বিবেচনায় চীনের সাথে সম্পর্ক খুব বেশি এগোতে পারেনি। তবে ড. ইউনূস সরকার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেনি। বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতিতে সেই পুরনো রূপ প্রত্যক্ষ করেছে, যা চীনের অংশটুকু বাদ দিলে জিয়াউর রহমান তার শাসনামলে শুরু করেছিলেন। তারেক রহমানের বর্তমান সরকার চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের সুফলভোগী, যেমন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের সুবিধাভোগী জিয়াউর রহমান। তবে এ দুই সরকারের মধ্যে কিছু দৃশ্যমান পার্থক্য আছে। জিয়াউর রহমানের সরকার কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেনি। কিন্তু তারেক রহমানের বর্তমান সরকার মালয়েশিয়া ও চীনে সফরের মতো সাহসী পদক্ষেপ নিলেও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে জড়তায় আছে।

ভারত শুরু থেকে তারেক রহমানের বর্তমান সরকারের সাথে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ উপেক্ষা করে চলেছে। একই সাথে কূটনৈতিক রীতিনীতি ভেঙে ভারতে বসে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দিয়ে তাকে একটি ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে ভারত এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের সাথে সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়।

আমরা মনে করি, ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল নীতি হওয়া উচিত ‘আস্থা নেই, বন্ধুত্ব নেই’-এর ভিত্তিতে। উভয় দেশের কাছেই পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব আছে। স্বার্থের কারণেই দুই দেশের অগ্রগতি হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ আন্তরিকভাবে ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়; কিন্তু ভারত সবসময় বড় ভাইসুলভ আচরণ করতে অভ্যস্ত। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা না করে নিজেরটা শতভাগ আদায় করতে চায়। ভারতের এই আচরণ বাংলাদেশের মানুষের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে কখনো সহায়ক নয়। এছাড়া অমীমাংসিত বিষয়গুলো বছরের পর বছর ঝুঁলিয়ে রেখেছে দিল্লি। শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের মানুষের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু নিজের স্বার্থ বিবেচনা করেছে এবং হাসিনা সরকারের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করেছে।

ভারতের বর্তমান মনোভাব বাংলাদেশের মানুষের সাথে কখনো ভালো সম্পর্ক তৈরি করবে না। ঢাকার সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইলে দিল্লিকে বর্তমান মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আর বর্তমানে দিল্লির কারণে দুই দেশের মধ্যে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে কোনো দেশই লাভবান হবে না। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অবসান হওয়া উচিত। সম্পর্ক হওয়া উচিত বাস্তবতার আলোকে, আবেগ দিয়ে নয়।

বর্তমান সরকারের ভারতের সাথে সম্পর্ক কী হবে বা কী হওয়া উচিত, এ নিয়ে যদি কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে থাকে, তবে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের মনে হয়েছে, এ পর্যন্ত তারেক রহমানের সরকার ভারতের সাথে সম্পর্ক নির্ণয়ে যে নীতি নিয়েছে, তা মোটামুটি ঠিকই আছে। ভারত বিষয়ে তারেক রহমান যে অবস্থান নিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশের মানুষ সন্তুষ্ট। একই সাথে, বিরোধী দলের সমর্থন ও সহযোগিতা নিশ্চিত করে পুরো জাতিকে সাথে নিয়ে সরকারকে ভারতনীতি প্রণয়ন করতে হবে। এটিই হবে টেকসই।

জিয়াউর রহমান দু’বার ভারত সফর করেছিলেন। এতে তার কোনো দ্বিধা ছিল না। ভারতের মোরারজি দেশাইয়ের সরকারের সাথে জিয়াউর রহমান হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ক্ষমতায় আসার ১৫ মাস পর ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি প্রথম সফর করেন। তার প্রায় তিন বছর পর ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে, যখন ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তখন তিনি দ্বিতীয়বার ভারত সফর করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ভারত সফরের মাত্র কয়েক মাস পর তিনি হত্যার শিকার হন।

ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। আমরা এটি পরিবর্তন করতে পারব না। তাই ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক হওয়া উচিত যুক্তিযুক্ত মাত্রায়। একই কথা চীন, আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কমাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একত্রে কাজ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য চীনের অর্থনৈতিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। এদিক বিবেচনায় ঢাকাকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রÑ উভয়ের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তবে এই ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য বড় বিষয়। একই সময়ে ভারতের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে পরাশক্তির সাথে সম্পর্ক রাখাই বর্তমান সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থবহ সফরের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকা উচিত। সরকারের উচিত ভারতের আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অন্য সব রাজনৈতিক নেতার দ্রুততম প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করা। তাড়াহুড়ো করে নয়, সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে ভারত সফরের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবকিছু প্রজ্ঞা ও কৌশলে সামলাতে হবে। কূটনীতিতে সংশয় ও দ্বিধা পরিহার করতে হবে।

লেখক : আইনের অধ্যাপক