জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পর এসে মূল প্রশ্নটি এর সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে নয়; বরং জুলাই যে রাজনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল, আমরা তাকে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পেরেছি, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এক অর্থে জুলাই নিঃসন্দেহে সফল। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুতই কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, দুর্নীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণপ্রতিরোধে পরিণত হয়েছিল। তবে যে বৃহৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষায় এত মানুষ জীবন দিয়েছেন, তা এখনো পূর্ণতা পায়নি। জুলাইয়ের ঐতিহাসিক সাফল্য নির্ভর করবে রাষ্ট্র পরিচালনার পুরনো নিয়ম ও ক্ষমতার কাঠামো আমরা বদলাতে পারি কি না তার ওপর।

জুলাই যা অর্জন করেছে
জুলাইয়ের প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক। আগের সরকার এমন ধারণা তৈরি করেছিল যে, তাকে অপসারণ করা অসম্ভব। নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল, বিরোধী দলগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করা হয়েছিল, ভিন্নমত প্রকাশ মামলা ও হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থরক্ষার যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। জুলাই ভেঙে দিয়েছে অজেয় থাকার সেই মিথ। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেশাজীবীসহ সাধারণ মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও রাস্তায় নেমেছিল। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদের ছবি রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানানো একটি প্রজন্মের নৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়। আওয়ামী সরকারের পতন ভবিষ্যতের প্রতিটি শাসকের জন্য একটি সতর্কবার্তা রেখে গেছে : পুলিশ, প্রশাসন ও দলীয় যন্ত্র যত শক্তিশালীই হোক, কোনো সরকারই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। এটি মোটেও ছোট অর্জন নয়।

জুলাই নির্বাচনী রাজনীতির পথও আবার খুলে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে চার কোটি ৭২ লাখের বেশি নাগরিক ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন; যা বৈধ ভোটের ৬৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ফলে নতুন সংসদের সামনে দু’টি পৃথক জনম্যান্ডেট রয়েছে : সরকার পরিচালনার নির্বাচনী ম্যান্ডেট এবং রাষ্ট্র সংস্কারের গণভোটের ম্যান্ডেট। প্রথমটি গ্রহণ করে দ্বিতীয়টি উপেক্ষার সুযোগ নেই।

১৯৯০-এর শিক্ষা
১৯৯০ ও ২০২৪ সালের ভিন্ন অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, সাংবিধানিক সংস্কার সংবিধান ছিন্ন করে নয়, রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হয়। ১৯৯০ সালের নভেম্বর নাগাদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল। প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলো তিন জোটের যৌথ রূপরেখায় একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথ ঠিক করেছিল। ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করলে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার ফিরিয়ে আনে। পরে একাদশ সংশোধনী ওই ব্যতিক্রমী ক্ষমতা হস্তান্তরকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয় এবং দ্বাদশ সংশোধনী সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

সেই বন্দোবস্ত সাংবিধানিকভাবে নিখুঁত ছিল না। তিন জোটের ঘোষণার অনেক অঙ্গীকার পরে বিস্মৃতও হয়েছে এবং সঙ্ঘাতমুখর রাজনীতি ফিরে এসেছে। তার পরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল : শাসকের পতনের আগেই রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, আর পরে আইনি সমন্বয় করা হয়। স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক সরকারের মাঝখানে সংবিধান একটি সেতুর ভূমিকা পালন করে।

২০২৪ সালে এমন কোনো রাজনৈতিক সমন্বিত রূপরেখা ছিল না। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলো আর বিশ্বাস করত না যে শেখ হাসিনার সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন বা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলুপ্তি, নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেয়া এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন- সব মিলিয়ে আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আস্থাটুকুও ধ্বংস হয়েছিল।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করার পর এবং পরদিন সংসদ ভেঙে দেয়া হলে বাংলাদেশ সাংবিধানিক শূন্যতার মুখোমুখি হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী তত্ত্বাবধায়ক কাঠামো বিলুপ্ত করেছিল; জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠনের কোনো স্পষ্ট বিধান তখন সংবিধানে ছিল না। রাষ্ট্রপতি ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে আপিল বিভাগের মতামত চান। আদালত মত দেয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সৃষ্টি হওয়া শূন্যতা পূরণে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগ করা যেতে পারে। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও উপদেষ্টারা শপথ নেন। এটি কোনো সাংবিধানিক উত্তরাধিকার ছিল না। ১০৬ অনুচ্ছেদ নিজে অন্তর্বর্তী সরকার সৃষ্টি করেনি; বরং একটি অপ্রত্যাশিত শূন্যতার ওপর আইনি সেতু নির্মাণে অনুচ্ছেদটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

সংবিধান স্থগিতের বিপদ
গণ-অভুত্থানের পর সংবিধান স্থগিতের কথা আকর্ষণীয় শোনাতে পারে। শাসক যখন সাংবিধানিক ভাষা ও প্রতিষ্ঠানকে নিজের ক্ষমতা স্থায়ী করার কাজে ব্যবহার করেন, তখন মানুষের কাছে সংবিধানকেই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অংশ মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সংবিধান কখনোই শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না। এটি ছিল প্রজাতন্ত্রের আইনি ভিত্তি এবং আদালত, রাষ্ট্রপতি, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসন ও সশস্ত্রবাহিনীর ক্ষমতার উৎস।

সংবিধান স্থগিত হলে সাথে সাথেই এমন একটি প্রশ্ন সামনে আসত, যার উত্তর বিপ্লবী স্লোগানে পাওয়া যায় না : সার্বভৌম ক্ষমতা কে প্রয়োগ করত? ছাত্র, অনির্বাচিত বিপ্লবী পরিষদ, সামরিক বাহিনী, রাষ্ট্রপতি, অন্তর্বর্তী উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দল, নাকি স্বঘোষিত কোনো গণপরিষদ? সীমাহীন সংবিধান প্রণয়নক্ষমতা প্রয়োগের জন্য এদের কারো কাছেই সর্বজনস্বীকৃত গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ছিল না।

সংবিধান স্থগিত হলেই সাধারণ আইনগুলো রাতারাতি বিলুপ্ত হয়ে যেত না। কোনো বিপ্লবী ঘোষণায় সেগুলো সাময়িকভাবে বহাল রাখা যেত। কিন্তু তখন আইনগুলোর বৈধতা প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক ব্যবস্থা থেকে নয়, নতুন কর্তৃপক্ষের অনুমতি থেকে আসত। আদালত খোলা থাকতে পারত; কিন্তু তার এখতিয়ার ও স্বাধীনতা নির্ভর করত সেই কর্তৃপক্ষের ওপর। মৌলিক অধিকারের ঘোষণা থাকতেও পারত; কিন্তু তা বাস্তবায়নের নিরাপদ সাংবিধানিক নিশ্চয়তা নাগরিকদের হাতে থাকত না।

বাংলাদেশ এর বিপদ আগেও দেখেছে। ১৯৮২ সালে এরশাদ সংবিধান স্থগিত করেন, নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেন এবং সামরিক ফরমানকে সাংবিধানিক আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেন। পরে সুপ্রিম কোর্ট তার শাসনকে দেয়া সাংবিধানিক বৈধতা বাতিল করে। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর সংবিধান স্থগিত করা হলেই সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হতো- এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। সংবিধান স্থগিত হলে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল সেই অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করতে পারত, যা তখন দেশের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনত না। এই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সঙ্কটের সমাধান খুঁজেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একটি গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সংবিধান স্থগিত হলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য সহজেই ‘বিপ্লবের বৈধ উত্তরাধিকারী কে’- এই ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারত। বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারে ফিরতে চেয়েছিল; অন্য দিকে ছাত্রনেতা ও কয়েকজন বুদ্ধিজীবী নির্বাচনের আগে আরো ব্যাপক রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের পক্ষে ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলোও বড় ধরনের সংস্কার সমর্থন করেছিল, তবে অনির্দিষ্ট মেয়াদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক ছিল। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো আইনি কাঠামো না থাকলে এসব ভিন্নমত স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকত না; বরং জুলাইকে ব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে- তা নিয়ে সঙ্ঘাতে পরিণত হতে পারত।

ধারাবাহিকতা মানেই স্থিতাবস্থা নয়
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার অর্থ জুলাই-পূর্ব ব্যবস্থাকে সমর্থন করা নয়। সেই ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, সংসদের স্বাধীনতা দুর্বল হয়েছিল, নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় দখল থেকে সুরক্ষা পায়নি। সংস্কার ছাড়া সেই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা জুলাইয়ের আকাক্সক্ষার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হতো।

তবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সংবিধানের প্রতিটি বিদ্যমান বিধান অপরিবর্তিত রাখা এক বিষয় নয়। স্পষ্ট গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবিধান ব্যাপকভাবে সংশোধন, আংশিক পুনর্লিখন, এমনকি প্রতিস্থাপনও করা যেতে পারে। সংসদ, সাংবিধানিক কনভেনশন, নির্বাচিত গণপরিষদ ও গণভোট- সবই এ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। শর্ত হলো, প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, আলোচনাভিত্তিক এবং জনগণের সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সংসদ অনুপস্থিত থাকলে সংস্কার সহজ নয়, বরং আরো কঠিন হয়। নির্বাচিত মঞ্চ না থাকলে মতবিরোধের নিষ্পত্তি প্রকাশ্য বিতর্ক ও রেকর্ডকৃত ভোটে হয় না; তা হয় প্রাতিষ্ঠানিক চাপ, রাজপথের শক্তি অথবা গোপন দর-কষাকষির মাধ্যমে।

জুলাই জাতীয় সনদ আলোচনাভিত্তিক সংস্কারের সম্ভাবনা ও জটিলতা- দু’টিই সামনে এনেছে। এতে ৮০টির বেশি প্রস্তাব জাতীয় আলোচনায় এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের অধিকতর স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোরতা শিথিল এবং মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা শক্তিশালী করা। গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নে দলগুলো ভিন্নমত লিপিবদ্ধ করেছে- এটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। আসল অর্জন হলো, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে কর্তৃত্ববাদের কাঠামোগত কারণ নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছে।

এখন সংস্কার কর্মসূচিকে একটি সাধারণ মানদণ্ডে বিচার করতে হবে : এটি কি ভবিষ্যতের কর্তৃত্ববাদী প্রকল্পকে কঠিন করে তুলবে? প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ছড়িয়ে দিতে হবে; সাংবিধানিক নিয়োগকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে; নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার সক্ষমতা সংসদকে দিতে হবে; বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসনকে দলীয় নির্দেশ থেকে সুরক্ষিত করতে হবে; এবং জনপ্রিয় সরকার হলেও তার বিরুদ্ধে নাগরিকের মৌলিক অধিকার কার্যকর রাখতে হবে।

আগের শাসনামলের হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন ও অন্যান্য অপরাধের জবাবদিহিও অপরিহার্য। কিন্তু ন্যায়বিচার যেন প্রতিশোধে পরিণত না হয়। যে শাসনকে গণ-অভ্যুত্থান প্রত্যাখ্যান করেছে, তার প্রক্রিয়াগত অন্যায় পুনরাবৃত্তি করে ভুক্তভোগীদের মর্যাদা রক্ষা করা যায় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক উদ্বেগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় : বিচার অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ, ব্যক্তিগত দায়, স্বাধীন আদালত এবং পূর্ণাঙ্গ যথাযথ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে হতে হবে। তা না হলে আজকের বিচারকে আগামীকাল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আরেকটি পর্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।

অসমাপ্ত প্রজাতন্ত্র
জুলাইয়ের সাফল্য কেবল কে ক্ষমতা হারাল এবং কে ক্ষমতা পেল- এই প্রশ্নে মাপা সবচেয়ে বড় ভুল হবে। একজন শাসক বিদায় নিলেই বিপ্লব টেকসই হয় না; বিপ্লব তখনই অর্থবহ হয়, যখন নাগরিক স্থায়ীভাবে শাসকের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার জন্য প্রয়োজন প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, কার্যকর সংসদ, স্বাধীন আদালত, জবাবদিহিমূলক নিরাপত্তা সংস্থা, প্রয়োগযোগ্য অধিকার এবং প্রতিটি দলের জন্য সমানভাবে কার্যকর সাংবিধানিক সীমা।

জুলাই স্থায়ী ক্ষমতার মিথ ভেঙেছে, রাজনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলেছে এবং রাষ্ট্র সংস্কারকে জনম্যান্ডেট দিয়েছে। এগুলো বড় অর্জন। বাংলাদেশ একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারকে অপসারণ করেছে; অথচ এমন একটি রাষ্ট্র এখনো নির্মাণ করতে পারেনি, যেখানে কর্তৃত্ববাদ সহজে ফিরে আসতে পারবে না।

জুলাইয়ের শহীদরা জীবন দেননি যাতে নতুন একটি গোষ্ঠী একই দফতরে বসে একই সীমাহীন ক্ষমতা প্রয়োগ করে। তাদের আত্মত্যাগ এমন একটি প্রজাতন্ত্র দাবি করে, যেখানে কোনো প্রধানমন্ত্রী সব প্রতিষ্ঠান দখল করতে পারবেন না, কোনো নিরাপত্তা সংস্থা নাগরিককে গুম করতে পারবে না, কোনো নির্বাচন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে না এবং কোনো দল আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না।

বাংলাদেশের এমন সংবিধানের প্রয়োজন নেই, যা জনগণের কাছ থেকে শাসককে রক্ষা করে। আবার এমন বিপ্লবও প্রয়োজন নেই, যা জনগণকে সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে। বিচক্ষণ পথ হলো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সাংবিধানিক ব্যবস্থার মূল চরিত্র বদলে দেয়া। জুলাই দুঃশাসন সরিয়েছে; এখন সংসদকে প্রজাতন্ত্র পূর্ণ করার দায়িত্ব নিতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

mwtanvir@gmail.com