যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তুলসি গ্যাবার্ড সম্প্রতি ভারত সফরকালে অপ্রাসঙ্গিকভাবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী এক সেমিনারে তুলসি গ্যাবার্ডের মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ বলে অভিহিত করেছেন। সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। প্রশ্ন হচ্ছে, যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে তারা এখন মানবাধিকার নিয়ে আমাদের সবক দিচ্ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি, জাপান ও ইতালির বিরুদ্ধে জয়লাভের পর থেকে ইউরোপ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একচ্ছত্র প্রভাবশালী নেতা হওয়ার যাত্রা শুরু করে। ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর দুর্বলতার সুযোগে দেশটি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা সেজে দুনিয়াজুড়ে নেতৃত্বের আসনটি দখল করে নেয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে এর বেশ গুরুত্বও রয়েছে। কিন্তু দেশটি গণতন্ত্র মানবাধিকার কথা ও কাজে কতটা মিল রাখছে তা পর্যালোচনা করে দেখা যাক।

আমেরিকান আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন : ইউরোপীয়রা চতুর্দশ শতাব্দীতে উত্তর আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপনের আগে সেখানে প্রায় দুই কোটি স্থানীয় আদিবাসী বসবাস করত। ইউরোপীয়রা তাদের নাম দিয়েছিল রেড ইন্ডিয়ান। তাদের সুসংগঠিত সমাজ কাঠামো ও শাসনব্যবস্থা ছিল। তারা যুগ যুগ ধরে ঔপনিবেশিক ইউরোপীয়দের হাতে নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে তাদের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় মাত্র তিন লাখে। আমেরিকান আদিবাসীদের উপর নির্যাতন, গণহত্যা, ভূমি দখল, ভাষা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে তাদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ২০০১ সালে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে একান্তে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল আমার। একজন আদিবাসী নারী আইনজীবী আমাদের জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তারা এখনো নানারকম বৈষম্যের শিকার। তারা সব জায়গায় জমি কিনতে পারেন না। এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। বিস্ময়কর একটি তথ্য হলো যে, ঔপনিবেশিক ইউরোপীয়রা রেড ইন্ডিয়ানদের হত্যা করতে রোগজীবাণু ছড়িয়ে দিত; এমনকি গুটি বসন্তের জীবাণুযুক্ত কম্বল তাদের মধ্যে বিতরণ করত।

দাস ব্যবসার উর্বরভূমি আমেরিকা : ১৮৬৫ সালের আগ পর্যন্ত ২৫০ বছর ধরে আমেরিকাতে দাস ব্যবসায় ছিল তাদের অর্থনীতির অন্যতম উৎস। আফ্রিকা থেকে ইউরোপীয় বণিকরা জোরজবরদস্তি করে কৃষ্ণাঙ্গদের লোহার শিকল পরিয়ে জাহাজে করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় নিয়ে বিক্রি করত। নির্যাতনের ফলে সমুদ্রপথে অনেকে মৃত্যুবরণ করত। তাদের সেখানে নিয়ে তামাক, চিনি ও তুলা খামারে কঠোর শ্রমসাধ্য কৃষিকাজ করানো হতো; একজন শ্রমিক বা দাসকে দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। নারীদের যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হতো। তাদের সন্তানদেরও দাস হিসেবে বাস করতে হতো। তাদের জন্য লেখাপড়া ছিল নিষিদ্ধ। একজন ক্রীতদাসকে নির্যাতন বা হত্যার অধিকার ছিল মালিকের। আমেরিকান সংবিধান দাসপ্রথাকে বৈধতা দিয়েছিল। নানা সময়ে বিভিন্ন স্থানে ক্রীতদাসরা শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। অনেকে পালিয়েও গেছেন। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় যে গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয় তার অন্যতম ইস্যু ছিল ক্রীতদাস প্রথার বিলোপ সাধন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন ১৮৬৩ সালে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ১৮৬৫ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথার জন্য শাস্তির বিধান করা হলেও কারাগারে দাসব্যবস্থা বহাল রাখা হয়। এখনো দেশটিতে ঠুনকো অজুহাতে তাদের গ্রেফতার করে কারাগারে দাসের জীবন কাটাতে বাধ্য করা হয়। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কালোরা তাদের কিছু অধিকার ফিরে পেলেও ক্লু ক্লাক্স ক্লন নামক শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থীরা কৃষ্ণাঙ্গদের উপর আক্রমণ অব্যাহত রাখে। পঞ্চাশের দশকে মার্টিন লুথার কিং, ম্যালকম এক্স প্রমুখ নেতার তীব্র আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমানাধিকারের আইনগত ব্যবস্থা করা হলেও ২০২০ সালে একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশের ব্ল্যাক নাগরিক জর্জ লয়েডকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করার দৃষ্টান্ত সারা বিশ্ব দেখেছে। আজও যুক্তরাষ্ট্রে ব্ল্যাক নাগরিকরা কম বেতন পান এবং নানাবিধ বৈষম্যের শিকার।

আণবিক বোমা : যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট যথাক্রমে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এতে দুই লক্ষাধিক লোক নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। আণবিক বোমার আঘাতে ও পরবর্তীতে তেজষ্ক্রিয়ায় বহু মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্মম নিষ্ঠুরতা ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি ছিল সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ : ১৯৫৪ সালে উত্তর ভিয়েতনাম ফ্রান্সের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করে দেশে কমিউনিজম চালু করে। দক্ষিণ ভিয়েতনামকেও একীভূত করার উদ্যোগ নেয়। দক্ষিণ ভিয়েতনামের শাসকরা ছিলেন কমিউনিজম-বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজমের সম্প্রসারণ প্রতিহত করতে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সহায়তায় এগিয়ে আসে। প্রথমে সামরিক সহায়তার আকারে থাকলেও ক্রমান্বয়ে সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। উত্তর ভিয়েতনামের সেনা এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গেরিলা ‘ভিয়েতকং’দের সম্মিলিত গেরিলা আক্রমণে মার্কিন সেনারা পর্যুদস্ত হয়। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত এ যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ লোক নিহত হন। এর মধ্যে মার্কিন সেনা ছিল ৫৮ হাজার ২২০ জন। অবশেষে নাকানি-চুবানি খেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম থেকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য হয়।

ইরান-ইরাক যুদ্ধ : ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়। ইরানের স্বৈরশাসক রেজা পাহলভিকে যুক্তরাষ্ট্র সার্বিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। তা সত্ত্বেও গণজাগরণের মুখে শাহের পতন ঠেকাতে পারেনি। কিন্তু বিপ্লবকে নস্যাৎ করতে মার্কিনিরা নানাবিধ ফন্দি-ফিকির করে। কিন্তু ইরানে ইসলামী বিপ্লব এতটা শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যে, আজ পর্যন্ত আমেরিকা তাকে টলাতে পারেনি। অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ থেকে শুরু করে নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনে বাধা দেয়ার কাজ এখনো চলছে। এক পর্যায়ে ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাকের সাদ্দামকে উসকানি দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত করে। একইসাথে সাদ্দামকে সামরিক অস্ত্র প্রদানসহ নানাভাবে সহায়তা করে। উদ্দেশ্য ছিল একটিইÑ ইরানকে পর্যুদস্ত করা। দুই ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশের মধ্যকার এ যুদ্ধে উভয়পক্ষে পাঁচ লাখ লোক নিহত হয়।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই : ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ১৯ সন্ত্রাসী যাত্রীবাহী বিমান হাইজ্যাক করে এবং নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হেড কোয়ার্টারে হামলা চালায়। এতে দুই সহস্রাধিক লোক নিহত হয়। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বিশ্বব্যাপী ‘ওয়্যার অন টেরর’ ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোট ছাড়াও ১৭০টি দেশ তার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। তারা আফগানিস্তানে অবস্থানকারী আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে টুইন টাওয়ার হামলায় দায়ী করে এবং তাকে হস্তান্তরে তালেবান সরকারকে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু তালেবান সরকার তাতে সম্মত না হওয়ায় আফগানিস্তানে ন্যাটোবাহিনী হামলা চালায় এবং বিপুল হতাহতের ঘটনা ঘটায়। এ যুদ্ধ প্রায় দুই দশক ধরে চলতে থাকে। এক পর্যায়ে পাকিস্তানকেও তারা সাথে পায়। এ যুদ্ধ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ। এতে দুই লাখ ৪০ হাজার আফগান নাগরিক প্রাণ হারায়। অবশেষে আফগান মুজাহিদদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে আমেরিকা ২০২১ সালে আফগানিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তালেবান সরকার আবার দেশের নেতৃত্ব নেয়।

ইরাক অভিযান : মজার বিষয় হলো যে ইরাককে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা দিয়েছিল ২০০৩ সালে আমেরিকা ও এর মিত্ররা সেই ইরাক আক্রমণ করে দেশটি দখল করে নেয়। শহর, বন্দর, গ্রামে শত সহস্র বোমা নিক্ষেপ করে নরকের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অবশেষে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন লুকানো অবস্থায় ধৃত হন। তাকে তথাকথিত বিচারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। সাদ্দামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তার সরকার সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদাকে সহায়তা করে এবং রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করেছে। যদিও পরবর্তীতে এ অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত এ যুদ্ধে প্রায় দুই লাখ ইরাকি নিহত হন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয় দুই ট্রিলিয়ন ডলার। অবশ্য ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্র কী পরিমাণ সম্পদ লুট করেছে এর হিসাব নেই।

লিবিয়ার গাদ্দাফিকে উৎখাতে সামরিক অভিযান : ২০১১ সালে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র সে দেশের বিদ্রোহীদের সমর্থন ও সহযোগিতা করে। এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়। অবশেষে বিবদমান পক্ষগুলো গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে এখনো দেশটিকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনে যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড : যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার থাকে। কিন্তু দেশটির ভেতরে ও বাইরে তার মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্ট উদাহরণ রয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি, ১৬০০ থেকে ১৯০০ শতক পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গরা আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর নির্মম নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড, উচ্ছেদ ও নানাবিধ বৈষম্যের মাধ্যমে তাদের নিজ ভূমিতে পরবাসী করে রাখে। ১৬১৯ সাল থেকে ১৯০০ শতক পর্যন্ত আফ্রিকা থেকে নিরীহ মানুষকে জোর করে ধরে এনে দাসবৃত্তিতে নিয়োজিত করেছিল। তাদের উপরও চালানো হয়েছিল নির্যাতনের অমানুষিক বর্বরতা। ১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত তারা ফিলিপিনের অসামরিক জনগণের ওপর নির্যাতন, লুটতরাজ, ধর্ষণ ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অপরাধ করে। ১৮৯৩ সালে মার্কিন সরকার বল প্রয়োগ করে হাওয়াইয়ের রাজতন্ত্র উৎখাত করে দ্বীপটি দখল করে নেয়। উনিশ শতকে ল্যাতিন আমেরিকার চিলি ও গুয়াতেমালার সরকার উৎখাতে হস্তক্ষেপ করে। আজও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ভালো নয়। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সরকার উৎখাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রেখে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সরকার উৎখাতে ১৫০টিরও বেশি হস্তক্ষেপ করেছে।

১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানের এক লাখ ৪২ হাজার সেনাকে বন্দী করে রাখে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। পরে আমেরিকানরা নিজেদের ভুল স্বীকার করেছিল। পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশকে আমেরিকান সিভিল রাইটস মুভমেন্টকে শক্তিপ্রয়োগ করে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। এর শেষ পরিণতি ঘটেছিল ১৯৬৮ সালে কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। আগেই বলা হয়েছে, মার্কিন সেনারা ভিয়েতনামে ঠাণ্ডা মাথায় মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। তারা নাপাম বোমা ফেলে অসামরিক জনতাকে হত্যা করেছে। সেখানকার মাইলাই হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে কালো অক্ষরে লেখা আছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যারা ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে তাদের উপরও নির্যাতন চালানো হয়েছে। ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেনের হামলার পরে পেট্রিয়ট অ্যাক্ট করে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিকৃষ্টতম উদাহরণ রেখেছে। গুয়ান্তানামো বের কারাগারে বিনাবিচারে বিভিন্ন দেশের শত শত নাগরিককে ধরে এনে যে নির্যাতন চালানো হতো তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিরল। ২০০০ সালের পর বিভিন্ন সময়ে অভিবাসন-প্রত্যাশীদের উপর বারবার যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে তা আমেরিকার গণতন্ত্রের অহঙ্কার চূর্ণ করে দিয়েছে। এমনকি শিশুদের তাদের মা-বাবা থেকে পৃথক করে দেয়া হয়েছে। মাত্র কিছু দিন আগে অবৈধ অভিবাসীদের মাথামুণ্ডন করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে যা সভ্যতার কলঙ্ক।

ফিলিস্তিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল : ১৯৪৮ সালে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও তাদের পাশ্চাত্য বন্ধুরা ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আজও তা অব্যাহত রেখেছে। বিগত ৭৫ বছরের কথা না হয় আপাতত মুলতবি রেখে সাম্প্রতিককালে অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইল যা করছে তা সভ্যতার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে প্রতিনিয়ত ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে; আমেরিকা সে অপরাধ সংঘটনে ইসরাইলকে সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে চলেছে। ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রতি বছর ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক, বোমা সব ছিল। শুধু আয়রন ডোমের জন্য দিয়েছে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। ১৯৪৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। এটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিদেশী রাষ্ট্রকে দেয়া সর্বোচ্চ পরিমাণ সহায়তা। এবারে ইসরাইল গাজায় যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড, অবরোধ, অবকাঠামো ধ্বংস করে চলেছে তার সব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহায়তায়। মূলত যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যুদ্ধের অংশীদার। জাতিসঙ্ঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, মানবাধিকার কমিশন, আন্তর্জাতিক আদালত কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছে না ইসরাইল। কারণ সবক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বহু প্রস্তাব উত্থাপন করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র সব সময় ভেটো দিচ্ছে। ফলে জাতিসঙ্ঘ একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

এই যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রেকর্ড সেখানে দেশটির রাষ্ট্রনেতাদের মুখে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সংখ্যালঘুর অধিকার নিয়ে কথা বলা যে একটি বড় ধরনের ভণ্ডামি ও প্রতারণা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব

ayubmiah@gmail.com