আমাদের দেশের অবহেলিত জনপদের নাম উত্তরবঙ্গ। এ অঞ্চলের মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ নানা ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার। এখানকার মানুষের দারিদ্র্যের কথা অস্বীকারের উপায় নেই। উত্তরের বেশ কয়েকটি জেলায় চরম দারিদ্র্য থেকে নিরুপায় হয়ে অনেকে ভিক্ষাবৃত্তির মতো অপমানকর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হন। এমন বাস্তবতায় বিগত সরকার ভিক্ষুকদের গ্লানিকর জীবন থেকে মুক্তি দিতে তাদের পুনর্বাসনে হাতে নেয় সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প। কিন্তু এই প্রকল্পের অর্থেও হয়েছে নয়ছয়। উত্তরের ১৬ জেলায় ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প সরকারিভাবে সফল দেখানো হলেও বাস্ততা ভিন্ন। এ প্রকল্প হাতে নেয়ার পরও নতুন ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়েছে। একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
দারিদ্র্যবিমোচনে ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ নামে কর্র্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ২০১০ সালের আগস্টে কর্মসূচি শুরু হলেও ওই সময় পুনর্বাসন কার্যক্রম তেমন গতি পায়নি। শুরু থেকে পরের ১৪ বছরে এ প্রকল্পে ৮৭ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪ কোটি ১০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয়ে কাগজে-কলমে পুনর্বাসনের সুবিধা পেয়েছেন ১৭ হাজার ৭১০ জন। বরাদ্দের প্রায় ২৮ কোটি টাকা ছিল উত্তরের ১৬ জেলায়।
বগুড়াকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে শারীরিকভাবে কাজ করতে পারেন এমন ব্যক্তির হাতে রিকশা-ভ্যান দিয়েছিল সমাজসেবা বিভাগ। অনেককে দেয়া হয় প্রশিক্ষণ। সমাজসেবা অধিদফতরের দাবি, ইতোমধ্যে সাত হাজার ২৯১ ভিক্ষুকের তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ শতাধিকজনকে পুনর্বাসন করা হয়। তবে তালিকার সাথে মেলেনি নিজস্ব বুলেটিনের তথ্য।
কুড়িগ্রামের উলিপুরে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউল ইসলাম মুকুলের বিরুদ্ধে বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। তিনি বরাদ্দের টাকা সুবিধাভোগীদের মধ্যে সঠিকভাবে বিতরণ করেননি। এটি মাত্র একটি উপজেলার উদাহরণ। অন্যান্য জেলার অবস্থাও একই রকম। কিছু জেলায় ভিক্ষুককে অর্থ না দিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে অনেক সচ্ছল ব্যক্তিকে। আবার ভিক্ষুককে যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে তার ক্ষুদ্র ব্যবসা চালানোর ব্যবস্থার কথা ছিল; তা না দিয়ে সামান্য কিছু অর্থ হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। ফলে সেই ভিক্ষুক ক্ষুদ্র ব্যবসা চালিয়ে যেতে না পেরে আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে গেছেন।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে দেশে চোরতন্ত্র কায়েম করা হয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নপর্যায় পর্যন্ত যে যেভাবে পেরেছেন দুর্নীতি করে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। কখনো সরকারি কর্মকর্তা ও আওয়ামী নেতাকর্মীরা মিলেমিশে দুর্নীতি করেছেন। ফলে ফ্যাসিবাদী জমানায় ভিক্ষাবৃত্তি নিরসনমূলক প্রকল্পের মতো একটি জনকল্যাণমূলক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও সফলতার মুখ দেখেনি। পতিত সরকার দেশে উন্নয়নের কথা বলে চিৎকার করলেও উত্তরবঙ্গের ভিক্ষুক বেড়ে যাওয়ার চিত্র এটি প্রমাণ করে যে, স্বৈরাচারী হাসিনার আমলে এটি ছিল ফাঁকা বুলি।
ভিক্ষাবৃত্তি দূর করতে বিগত সরকার ২০১০ সালে যে উদ্যোগ নেয় তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতায় ব্যর্র্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের ভিক্ষাবৃত্তি দূরীকরণ প্রকল্পে অনিয়মের সাথে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া অপরিহার্য।