দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা প্রায় ২৬ হাজার ১০৪টি। সরকারি ৬১৩টি। এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৩১৬। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বলে দেয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি স্কুল-কলেজ সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। বেসরকারি বিশেষ করে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় সরকার অনুমোদিত কমিটি দিয়ে। এতে দেখা যায়, বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ না পেয়ে রাজনীতি-সম্পৃক্তরা জায়গা করে নেন। এতে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এটি জিইয়ে রাখা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এর প্রতিকার চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট দায়ের হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি স্কুল-কলেজের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত বা দলীয় পদধারীদের অযোগ্য ঘোষণার প্রশ্নে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। আদালত জানতে চেয়েছেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত কিংবা দলীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচন, মনোনয়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করে বিদ্যমান প্রবিধান সংশোধন অথবা নতুন বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না। স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত শিক্ষানুরাগী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিশিষ্ট সমাজসেবক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, চিকিৎসক এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নাগরিকদের এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিধান ও বিচারিক নির্দেশনা (জুডিশিয়াল গাইডলাইন) জারির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও আদালত ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবর্তে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ সময়ের দাবি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে পরিচালনা কমিটি গঠিত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সহজ হয়। জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কল্যাণ অগ্রাধিকার পায়। এতে শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা বাড়ে এবং শিক্ষাদানের মান উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন।

অপ্রয়োজনীয় বিরোধ, প্রভাব বিস্তার কিংবা দলীয় বিভাজনের ঝুঁকি কমে আসে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষাবিদ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণেও সহায়ক হতে পারে। তারা শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মতো বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিতে পারেন। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুগোপযোগী ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি যদি শিক্ষা ও জনস্বার্থ ঘিরে গঠিত হয়, তবে শিক্ষাঙ্গনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পথ আরো সুগম হবে। একটি রাজনীতিমুক্ত, দক্ষ ও দায়িত্বশীল পরিচালনা কাঠামো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।