বাংলাদেশ-মিয়ানমার-কুনমিং করিডোর প্রস্তাবনাটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। চীনের কুনমিং থেকে শুরু করে মিয়ানমারের বুক চিরে বাংলাদেশের মানচিত্রকে স্পর্শ করার এই মহাপরিকল্পনা কেবল একটি সড়ক বা রেল সংযোগ নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের জন্য একাধারে এক বিশাল সম্ভাবনার মহাসড়ক এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের এক কঠিন পরীক্ষা।
এই করিডোরটি চীনের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত, যা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ‘অর্থনৈতিক সেতু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বর্তমানে চীনের মূল ভূখণ্ডে বাংলাদেশের পণ্য পাঠাতে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হয়। কুনমিং করিডোর চালু হলে স্থলপথে মাত্র কয়েক দিনে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে, যা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে। শুধু চীন নয়, মিয়ানমার ও চীনের সাথে যুক্ত থাকা লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ আসিয়ান অঞ্চলের বিশাল বাজারেও বাংলাদেশের পণ্য রফতানির এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হবে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান অর্থায়নকারী দেশ। বাংলাদেশের মোট আমদানির একটি বিশাল অংশ আসে চীন থেকে (২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি)। তবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, তা দূর করতে এই করিডোর বড় অনুঘটক হতে পারে। পদ্মা সেতু রেল লিঙ্ক, কর্ণফুলী টানেল বা পায়রা বন্দরের মতো মেগা প্রজেক্টগুলোতে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়বে, যা দেশের লাখো তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
দেশের অভ্যন্তরে চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মেগা প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের ভলিউম বৃদ্ধি পাবে, যা এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তি দেবে। এই করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে তার কৌশলগত অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে পারবে। এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বৃদ্ধি করবে এবং আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের ভূমিকা
বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত হয়ে থাকা রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীনের এই প্রভাবকে কাজে লাগানো সম্ভব। চীন যদি এই অঞ্চলে নিজের অর্থনৈতিক করিডোরের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চায়, তবে তাদের মধ্যস্থতাতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। মিয়ানমারের ওপর চীনের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যাপক প্রভাব। বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষায় চীন বরাবরই ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বোঝা। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও বর্তমান জান্তাবিরোধী সঙ্ঘাতের মাঝে চীনই একমাত্র দেশ, যারা উভয় পক্ষের সাথে কথা করতে পারে। চীন ইতোমধ্যে ত্রিপক্ষীয় (বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন) উদ্যোগের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করেছে। কুনমিং করিডোরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চীন নিজের স্বার্থেই মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করার একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক লিভারেজ পাবে।
তবে এই করিডোরের অর্থনৈতিক সুফলের পিঠে চড়ে আসে জটিল ভূরাজনীতি। করিডোরটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা, যা বর্তমানে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সাথেও চীনের সুগভীর যোগাযোগ রয়েছে। রাখাইনে চীনের বিলিয়ন ডলারের ‘কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর’ ও তেল-গ্যাস পাইপলাইনের প্রকল্প রয়েছে, যা আরাকান আর্মি কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। চীন মূলত নিজের স্বার্থেই উভয় পক্ষের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখে। চীনের এই দ্বিমুখী প্রভাবের কারণে করিডোর নির্মাণ ও তার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় কোনো সামরিক বাধা আসবে বলে মনে হয় না। চীন নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের সাথে সমঝোতা বজায় রাখবে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।
চীনের বিশ্বব্যাপী মহাপরিকল্পনা
চীনের বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো নির্মাণের মহাপরিকল্পনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ছয়টি করিডোর চূড়ান্ত হয়েছে। এর বাইরেও চীনের নিজস্ব উদ্যোগে কিছু ঐতিহাসিক ও কৌশলগত করিডোর রয়েছে। চীন-পাকিস্তান করিডোরটি চীনের শিনজিয়াং প্রদেশকে পাকিস্তানের আরব সাগরের তীরবর্তী গোয়াদর বন্দরের সাথে যুক্ত করেছে। এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার। চীন এই প্রকল্পে প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। করিডোরের ধরন হচ্ছে সড়ক, রেলপথ, তেল-গ্যাস পাইপলাইন এবং বন্দর অবকাঠামো। এই করিডোরের মাধ্যমে চীন পারস্য উপসাগরের তেল মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে সরাসরি স্থলপথে নিজের দেশে নিয়ে যেতে পারছে, যা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিশাল বড় বিপ্লব।
মিয়ানমার ও চীন করিডোর। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হওয়ার কারণে এই করিডোরটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। মসৃণ সড়ক, উচ্চগতির রেলপথ এবং গভীর সমুদ্রবন্দর এই করিডোরের বৈশিষ্ট্য। এই করিডোরের মাধ্যমে চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার পেয়েছে। এর ফলে চীন মালাক্কা প্রণালীকে বাইপাস করে সরাসরি ভারত মহাসাগরে নিজের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পেরেছে।
নিউ ইউরেশিয়ান ল্যান্ড ব্রিজ (NELB)। এটি আধুনিক যুগের এক বিশাল আন্তর্জাতিক করিডোর, যা এশিয়া ও ইউরোপকে স্থলপথে যুক্ত করেছে। চীন, কাজাখস্তান, রাশিয়া, বেলারুশ, পোল্যান্ড এবং জার্মানি এই করিডোরের সাথে যুক্ত। এটা মূলত আন্তঃমহাদেশীয় রেল নেটওয়ার্ক। এটি চীনের লিয়ানইউনগাং বন্দর থেকে শুরু হয়ে মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া হয়ে ইউরোপের জার্মানি (ডুইসবার্গ) ও রটারড্যাম বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই করিডোরের মাধ্যমে চীনের পণ্যবাহী ট্রেন মাত্র ১৫ থেকে ১৮ দিনে ইউরোপে পৌঁছাতে পারে, যেখানে সমুদ্রপথে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। এটি চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যের মেরুদণ্ড।
চীন-মধ্য এশিয়া-পশ্চিম এশিয়া অর্থনৈতিক করিডোর (CCWAEC)। এটি প্রাচীন সিল্ক রোডের একটি আধুনিক সংস্করণ। চীন, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক এর সাথে যুক্ত। রেল, সড়ক ও গ্যাস পাইপলাইন এই করিডোরের বৈশিষ্ট্য। এটি চীনের শিনজিয়াং থেকে শুরু হয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো এবং ইরান হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই করিডোরটি মূলত জ্বালানি সমৃদ্ধ মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস সরাসরি চীনে সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হয়। একই সাথে এটি ইউরোপের বিকল্প স্থলপথ। চীন-মঙ্গোলিয়া-রাশিয়া অর্থনৈতিক করিডোর (CMREC)। উত্তর এশিয়ার অর্থনৈতিক অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য এই করিডোরটি তৈরি করা হয়েছে। চীন, মঙ্গোলিয়া এবং রাশিয়া এই করিডোরের সাথে যুক্ত। সড়ক, রেল ও জ্বালানি গ্রিড এই করিডোরের বৈশিষ্ট্য। এটি চীনের বেইজিং-তিয়ানজিন অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে মঙ্গোলিয়ার উলানবাটর হয়ে রাশিয়ার সাইবেরিয়ান অঞ্চলের রেল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হয়েছে। রাশিয়ার খনিজ ও জ্বালানিসম্পদ এবং মঙ্গোলিয়ার কাঁচামাল সহজে চীনে নেয়ার জন্য এই করিডোর অত্যন্ত কার্যকর।
চীন-ইন্দোচীন উপদ্বীপ অর্থনৈতিক করিডোর (CICPEC)। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে চীনের বাণিজ্যের প্রধান রুট এটি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো হচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর। মহাসড়ক এবং উচ্চগতির রেলপথ (যেমন : চীন-লাওস রেলওয়ে) এই করিডোরের উল্লেখযোগ্য দিক। চীনের পার্ল রিভার ডেল্টা এবং ইউনান প্রদেশ থেকে শুরু করে এই করিডোরটি সমগ্র ইন্দোচীন উপদ্বীপজুড়ে বিস্তৃত। আসিয়ান দেশগুলোর সাথে চীনের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সফল করতে এবং এই অঞ্চলের সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে এই করিডোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
চীন মূলত তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুরক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাথে এই করিডোরগুলো তৈরি করেছে। এতে চীনের যেমন বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ছে তেমনি করিডোরের সাথে যুক্ত দেশগুলো চীনের প্রভাববলয়ের অধীনে চলে আসছে। পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক দিগন্তও প্রসারিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের এক জরিপে দেখা যায় বিশ্বের ২৫টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের প্রতি বেশি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। পৃথিবীর ৩৬টি দেশে ৪২ হাজারের বেশি মানুষকে নিয়ে এ জরিপ পরিচালিত হয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে, প্রতিটি করিডোরই চীনকে সমুদ্রপথের দীর্ঘসূত্রতা বা মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ‘মালাক্কা প্রণালী’র ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করছে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া
এই সমীকরণের সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়টি হলো প্রতিবেশী ভারতের প্রতিক্রিয়া। সীমান্ত বিরোধ এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াইয়ে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই বৈরী। চীনের এই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি নয়াদিল্লিকে চাপে ফেলবে। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে চীনের প্রভাব বাড়ুক, তা ভারত কখনোই চাইবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি দিল্লির সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক আমাদের রাখতে হবে।
এখানে প্রয়োজন বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। চীন যেমন আমাদের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বড় অংশীদার, ভারতও তেমনি আমাদের প্রতিবেশী।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-কুনমিং করিডোর বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এই ভূরাজনৈতিক দাবার চালে বাংলাদেশ যেন ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে থাকে। চীনের সহায়তা নিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটতে হবে। ভূ-অর্থনৈতিক এই মহাসড়কে পা রাখার আগে দূরদর্শী ও সুসংহত কূটনীতিই হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার হাতিয়ার।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার