বহুল আলোচিত ও সমালোচিত এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব বিলুপ্তির নামে নতুন রূপে আসছে। বিরোধী মত দমনে নির্বিচারে গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল বাহিনীটি। গড়ে তুলেছিল অসংখ্য আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালা। এমনকি নারায়ণগঞ্জের সাত খুনসহ চাঁদাবাজি, লুণ্ঠনের মতো নানা ফৌজদারি অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছিল এ বাহিনীর সদস্য। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালে এ বাহিনী ও এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথচ ২০০৪ সালে গঠনের পর আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে কিছু প্রশংসনীয় কাজ করেছিল র‌্যাব। ২০০৯ সালের পর ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে বাহিনীটি সরকারের দমননীতির অংশ হয়ে পড়ে। তবে এক্ষেত্রে শুধু র‌্যাব নয়; পুলিশ, গোয়েন্দা নজরদারি ও নিরাপত্তা সংস্থাসহ সেনাসদস্যদের একাংশেরও একই ভূমিকা ছিল।

২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর পুলিশসহ র‌্যাবের আমূল সংস্কারের প্রশ্ন সামনে আসে। একপর্যায়ে র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি ওঠে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাও সুপারিশ করে। বিএনপির নির্বাচিত সরকার র‌্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য খসড়া আইনও তৈরি। চলতি মাসেই তা চূড়ান্ত হতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি গণমাধ্যমে যেসব তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে তাতে র‌্যাব বিলুপ্ত নয়; বরং র‌্যাবের শুধু নাম পাল্টাচ্ছে। নতুন একটি এলিট বাহিনী হতে যাচ্ছে নতুন নামে।

বাহিনীটি থাকবে পুলিশের অধীনে, তবে র‌্যাবের ক্ষমতা, র‌্যাবের জনবল- সবই এতে যুক্ত হবে। এমনকি নতুন বাহিনীর সদস্যরা কিছু ক্ষেত্রে বিনা পরোয়ানায় কারো ঘরে ঢোকা, তল্লাশি চালানো ও গ্রেফতারের ক্ষমতাও পেতে যাচ্ছে। শুধু যুক্ত হবে জবাবদিহির ব্যবস্থা- প্রতিকার কমিটি।

বাংলায় একটি পুরনো প্রবাদ আছে- থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। অর্থাৎ, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই জিনিসের উপস্থাপন। ইংরেজিতে যাকে বলে, নতুন বোতলে পুরনো মদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় র‌্যাব নিয়ে যা করতে যাচ্ছে, একে বিএনপির দলীয় অবস্থানের বাইরের কিছু ভাবার সুযোগ নেই।

গত নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে দলটি যেমন অবস্থান নিয়েছিল, সরকারে বসার পরও সেই অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। সংস্কার, গণভোট প্রসঙ্গে সংসদের ভেতরে-বাইরে সরকারের অবস্থান থেকে সেটি স্পষ্ট।

আমূল সংস্কারের জন্য সাহস ও দূরদর্শিতা দরকার। পিছুটানমুক্ত হওয়াও জরুরি। বিএনপির কোনো পিছুটান তো থাকার কথা নয়। আওয়ামী লীগের মতোই পুরনো রাজনীতি, পুরনো ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে থাকার কথাও নয়।

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, নতুন নাম দিয়ে পুরনো বাহিনী নামানোর কোনো অর্থ নেই। আমূল সংস্কার ও মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া বাস্তব ও টেকসই সুফল পাওয়া যাবে না। অন্ধকারের অচলায়তন ভাঙবে না।

দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে নতুন বাহিনীর যদি সত্যিই দরকার থাকে তবে র‌্যাবের আদলে নয়, সম্পূর্ণ নতুন চরিত্রের নতুন বাহিনী গড়া যেতে পারে, যার মূল নীতি হবে মানবাধিকার ও জনগণের মর্যাদা সমুন্নত রেখে অপরাধ দমন।