বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রাণবন্ত যাত্রা শুরু হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে প্রথম অধিবেশনে অনেকটা উৎসবমুখর পরিবেশে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সভাপতিমণ্ডলীর পাঁচ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদকে সব আলোচনার কেন্দ্র বানানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ভাষণ দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের কণ্ঠেও প্রায় একই ধরনের তাগিদ লক্ষ করা গেছে।

বাংলাদেশে সংসদীয় রাজনীতি বরাবর হোঁচট খেয়েছে। সর্বশেষ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা একে পরিবারের স্তূতি-স্তাবকতা এবং বিরোধীদের চরিত্র হননের ভাগাড়ে পরিণত করেছিলেন। প্রত্যাশা, নতুন সংসদ জন-অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে।

সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে দলীয় পদ থেকে ইস্তফা নিয়েছেন তিনি। সংসদ পরিচালনায় স্পিকারের কাছ থেকে বিরোধী দল উপযুক্ত নিরপেক্ষ আচরণ প্রত্যাশা করে। বিরোধীদলীয় নেতা তার ভাষণে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। প্রথম দিন সংসদ পরিচালনায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধীরা আগ্রহভরে অংশ নিয়েছেন।

সংসদকে কার্যকর করতে হলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকারি দলকে বিরোধীপক্ষকে আস্থায় নিতে হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল সরকারি দল। জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিরোধী দল। তারা সরকারি দলের দান হিসেবে তা নিতে চাননি। উভয়পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়া গভীর হতে জুলাই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিরোধীদের উপযুক্ত মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি দলের শোকপ্রস্তাবে নিজ দলের নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও বিরোধী শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের নাম বাদ পড়ে যায়। ফ্যাসিবাদী সরকার বিচারিক প্রহসন চালিয়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে। সঙ্গতকারণে তারা তালিকায় অগ্রাধিকার পেতে পারতেন।

সংসদ অধিবেশন উত্তপ্ত হয়ে উঠে হাসিনা আমলের রাষ্ট্রপতির উদ্বোধনী দিনের ভাষণ নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি দুর্বলতম দিক এ ভাষণে উন্মোচিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন বেশ কিছু কর্মকাণ্ডের জন্য সমালোচিত। তিনি ছিলেন হাসিনা সরকারের কট্টর সমর্থক। বিরোধীদের নিয়ে বারবার অন্যায্য সমালোচনা করেছেন। সেই তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিবাদী শাসক বলেছেন। আগে যেসব রাজনৈতিক নেতাকে অপবাদ দিয়েছেন, তাদের প্রশংসা করেছেন। বিরোধীরা তাকে ফ্যাসিবাদের প্রতিভূ আখ্যা দিয়ে এই সংসদে তার ভাষণের প্রতিবাদ করে অধিবেশন ত্যাগ করেন। একটি উন্নত গঠনমূলক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সংসদীয় রাজনীতির গোড়াপত্তন করতে হলে এই ধরনের দ্বিচারিতা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশের সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতি এমন একজন ব্যক্তি হতে পারেন না, তিনি সরকার বদলের সাথে সাথে তার কথা বদলে ফেলবেন।

এই সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিপুল রক্তের বিনিময়ে। তারা একটি সুন্দর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বুকের তাজা দিয়ে রাজপথ রাঙিয়েছেন। নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়ার পর সরকারি দল জুলাই সনদ আদৌ বাস্তবায়ন করবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় রয়েছে জনমনে। জাতি আশা করে, সরকার সব সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে সত্যিকার অর্থে একটি কার্যকর সংসদ গড়ে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে হাঁটবে।