বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটে গেছে। এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দৈনন্দিন জীবনের সব কর্মক্ষেত্রে। এরই মধ্যে এটি হয়ে উঠেছে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ব্যবসায়-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, শিল্প উৎপাদন, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, এমনকি রাজনীতি- প্রায় প্রতিটি খাতে ঢুকে যাচ্ছে এই প্রযুক্তি। কিন্তু এর ব্যবহার অর্থাৎ- সম্ভাবনা কাজে লাগানো অথবা কুফল থেকে বেঁচে থাকার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি প্রায় নেই বললেই চলে।
ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের জন্য হতে যাচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। তথ্য ও প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এআই আগামী দিনে যেমন অসীম সম্ভাবনা তৈরি করবে, তেমনি গুরুতর চ্যালেঞ্জও সামনে আনবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভুয়া তথ্য এবং ডিপ ফেক। জনমত প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে ডিপ ফেকের অপব্যবহার এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। সাইবার স্পেসে চলছে রীতিমতো যুদ্ধ। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক পোস্ট ও ভিডিও আপলোড করছেন। জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে, দেশে বিশৃঙ্খলার আবহ তৈরি হচ্ছে।
এআইয়ের মাধ্যমে সাইবার হামলা ও অপরাধ আরো স্বয়ংক্রিয় ও জটিল হতে পারে। কারণ অপরাধীরাও এআই ব্যবহার করবে। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ডাটার নিরাপত্তা এবং এআই মডেলের পক্ষপাত নিয়েও উদ্বেগ আছে। আইন, নৈতিকতা ও প্রযুক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও কঠিন হয়ে উঠছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বেও একই অবস্থা। ২০১৬ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বট আইডি দিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে।
তবে শুধু নেতিবাচক দিকই প্রধান নয়। এআই বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এআই প্রযুক্তি আমাদের তৈরী পোশাক খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, কৃষিতে রোগ ও আবহাওয়া বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক স্ক্রিনিং, শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সহায়তাসহ বহু ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
আমাদের তরুণদের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের প্রবল আগ্রহ আছে। শতাধিক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপ এখন এআই ও মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করছে। দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেশিন লার্নিং, ডাটা সায়েন্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পড়াশোনা এবং গবেষণা হচ্ছে। তরুণদের অনেকে নানাভাবে দক্ষতা অর্জন করছেন।
বাংলাদেশ যদি ডাটা অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং গবেষণা-শিল্প খাত সংযোগ বাড়াতে পারে, তাহলে এআইকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। সেই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এআই ও ডাটা সায়েন্সের আধুনিক পাঠ্যতালিকা প্রণয়ন, শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শক্তিশালী ডাটা সেন্টারসহ এআই গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যারের চাহিদা পূরণ করতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্য সুরক্ষা নিয়ে আইন ও নীতিমালা থাকলেও এআই-নির্ভর ঝুঁকি মোকাবেলায় বাস্তব প্রস্তুতি এখনো নেই। এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতে সবার আগে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের বিকল্প নেই।