দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক গঠনের মধ্য দিয়ে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, সংস্থাটি সত্যিকার অর্থে দেশের দুর্নীতি দমনে কাজ করবে। কিন্তু দুদক যতটা না তার লক্ষ্য পূরণে কাজ করতে পেরেছে, তার চেয়েও বেশি কাজ করেছে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। এ নিয়ে নানা মহলের সমালোচনা কিংবা পরামর্শ, কোনো কিছুতেই কান দেয়া হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দুদককে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এ লক্ষ্যে কমিশন বেশ কিছু সুপারিশও করে। কিন্তু বর্তমান সরকার সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো উপেক্ষা করে দুদক আইন পাস করে। তাছাড়া সাংবিধানিক বিধিনিষেধ বিবেচনায় না নিয়ে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নতুন কমিশন কতটুকু স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কিংবা জনপ্রত্যাশা পূরণ করবে- তাই এখন দেখার বিষয়।
দুদক প্রতিষ্ঠার পর প্রতিষ্ঠানটিকে নগ্নভাবে মানুষের চরিত্র হননের জন্য ব্যবহার করে এক-এগারোর ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকার। সেই সরকার কোনো প্রকার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচার ছাড়াই রাজনৈতিক নেতাদেরসহ সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষকে দুর্নীতিবাজ বলে আখ্যা দিতে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেয়। কিন্তু সেই সরকার মামলাগুলোর কোনো সুরাহা করে যেতে পারেনি। এরপর শেখ হাসিনার সরকার এলে দুদককে ব্যবহারের পুরনো কৌশল অব্যাহত থেকে যায়।
আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বিরুদ্ধে করা দুদকের মামলাগুলো বাতিল করলেও তৎকালীন বিরোধী দল-বিএনপির মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে থাকে। তখন দুদকের এক মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সাজা দেয় শেখ হাসিনা সরকারের অনুগত বিচারক। দুদককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কুফল হাসিনা পেয়েছেন। জনগণ তাকে শুধু প্রত্যাখ্যানই করেনি, দেশ থেকে তাকে ও তার দলকে বিতাড়িতও করেছে। তাই দুদক যাতে আর কখনো রাজনৈতিক হাতিয়ার কিংবা কাউকে হয়রানি করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না হয়, সেটি বর্তমান সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
নব নিয়োগকৃত কমিশনের সামনে এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ এসেছে। এগুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সুরাহা করতে হবে।
একটি বড় সময় ধরে দুদক অভিভাবকহীন থাকায় দুর্নীতির যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে, সেগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। এসব বিষয়ে দুদককে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
দুদকের মামলার স্তূপ হয়ে পড়ে আছে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। গণামাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, বর্তমানে সারা দেশে ১১ হাজার ৭৫৩টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলা যাতে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিষ্পন্ন হতে পারে, সে বিষয়ে দুদককে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাত এবং সরকারি প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। এ ছাড়াও দুদকের এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো- বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করা। এতে দুদককে পারঙ্গমতা দেখাতে হবে।
একটি দেশে দুর্নীতি যাতে না হতে পারে, সে জন্য দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শুধু দুদককে দিয়েই সমাজ ও রাষ্ট্রের দুর্নীতি দমন কিংবা নিয়ন্ত্রণ- কোনোটিই সম্ভব নয়।
দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ আইন কিংবা কোনো মানুষের ভয় নয়; বরং নিজেদের নৈতিক মূল্যবোধের তাড়নায় দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকতে পারে। এভাবে সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে দুর্নীতি বন্ধে কাজ না করলে এক দুদক দিয়ে কখনোই দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়।