মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে কবিতা পাঠের আসর হলো গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার। রাসূল সা:-এর জন্ম মাস পবিত্র রবিউল আউয়ালকে স্বাগত জানিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটে বায়তুশ শরফ ঢাকা বিভাগের ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রিয় নবীজি সা:-কে নিবেদিত কবিতা পাঠ ও নাত পেশ করেন অন্তত ৪০ জন কবি। বেলা ৩টার পর শুরু হয়ে নামাজের বিরতিসহ প্রায় সাড়ে ৭টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলা অনুষ্ঠান ছিল নিখুঁত ও সুচারু। ২০২৫ সালেও তারা এমন আয়োজন করেছিলেন। এবারের অনুষ্ঠান ছিল আরো বিস্তৃত ও পরিকল্পিত।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রথম দেশে রাসূল সা:-কে নিবেদিত কবিতা পাঠের আয়োজন করে। এখন ইসলামী ধারার অনেক সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন এ ধরনের অনুষ্ঠান করছে। এটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় গৃহীত হয়েছে। সে দিক থেকে বায়তুশ শরফের আয়োজন অভিনব নয়। তবে একটি নতুনত্ব আছে। সে কথাই বলব।
অভিনব না হলেও অনুষ্ঠানে একটি বড় কাজ করেছেন অনুষ্ঠানের আয়োজক ও সভাপতি প্রখ্যাত গবেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ঈসা শাহেদী। বাছাই করা ১৫ জন কবিকে দিয়েছেন বিশেষ সম্মাননা। কোনো অর্থমূল্যে নয়, তিনি কবিদের গলায় পরিয়ে দেন বুরদা। বুরদা মানে চাদর বা গিলাফ। সেই চাদরে রাসূল সা:-এর উদ্দেশে নিবেদিত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিতা, মিসরের বিখ্যাত সুফি সাধক ও কবি ইমাম শরফুদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে সায়িদ আল-বুসিরির রহ: লেখা কাসিদাতুল বুরদার অংশবিশেষ প্রিন্ট করা। বোঝা যায়, সুপরিকল্পিতভাবে কাজটি করেছেন তারা।
এটিকে বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরীয় পরিয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়া মনে হতে পারে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশে বাঙালি সংস্কৃতিসেবীরা জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের সম্মাননা হিসেবে উত্তরীয় পরিয়ে দেন। এটি প্রাচীন ভারতীয় কেতা। বৈষ্ণব ধর্মে চল ছিল। বৌদ্ধদের প্রবারণা পূর্ণিমায় ভিক্ষুদের চিবর দান সুপ্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। ইসলাম ধর্মে এর প্রচলন এখন নেই বললেই চলে। তবে একসময় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এবং সুফিদের মধ্যে বুরদা দানের চল ছিল শুনেছি। সাম্প্রতিক সময়ে বাঙালি সংস্কৃতির প্রবক্তারা পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের অনুকরণে বাংলাদেশেও উত্তরীয় দানের রীতি চালু করেছেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তা গ্রহণ করা হয় আওয়ামী লীগের আমলে।

কেউ বলতে পারেন, উত্তরীয় বলি বা বুরদা, জিনিস তো সেই একই থাকছে। চাদর। এ নিয়ে পেরেশান হওয়ার কী আছে? আমরা বলি, অনেক কিছু আছে। নির্ভর করে আপনার বোধ-বুদ্ধি-বিবেক আর আত্মসচেতনতার ওপর।
আমাদের ভাষা সংস্কৃতি রাজনীতি অর্থনীতিসহ সব কিছুর ওপর বাইরের প্রভাব, হস্তক্ষেপ, আধিপত্য কিভাবে সক্রিয়, কিভাবে এগুলো মুছে ফেলে ভিনদেশী ভাষা সংস্কৃতি রাজনীতি চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চলছে, সে বিষয়ে আপনার যদি কোনো বোধ না থাকে; ‘পানি’ ও ‘জল’; ‘রক্ত’ আর ‘খুন’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে ধুন্ধুমার রাজনীতির কোনো আওয়াজ যদি আপনার কানে না পৌঁছে থাকে, তাহলে কোনো কথা নেই। পয়লা এপ্রিলে আপনি মানুষকে বোকা বানিয়ে ‘এপ্রিল ফুল’ পালন করবেন, নাকি স্পেনে খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের হাতে হাজারো মুসলিম নারী-পুরুষ-শিশুকে নির্বিচারে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় শোকের আবহে মনে করবেন, সেটিও আপনার বোধ-বুদ্ধি-চেতনার ওপর নির্ভর।
যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভৌগোলিক রাষ্ট্রসীমা আপনার অস্তিত্বের উৎস, সেটিকে সুচিহ্নিত ও নিরাপদ রাখার ন্যূনতম তাগিদ যদি বোধ করেন, যদি নিজ সংস্কৃতির মৌলিকতা রক্ষার এবং মায়ের ভাষার স্বকীয়তা ধরে রাখতে চান, তাহলে এক একটি শব্দ নিয়েও পেরেশান হওয়ার দরকার আছে।
একটি কবিতায় কবি বলছেন-
‘আমরা টের পাইনি
আমাদের ঝরনা কলম কবে ডট্ পেন হয়ে গেছে
আমাদের বড়বাবু কবে হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন
আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন।
আমরা বুঝতে পারিনি
আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।’
কী সর্বনাশ হয়েছে বুঝতে হবে। বাংলায় পিতাকে ‘বাবা’ সম্বোধন করা হয়, হিন্দিতে ‘বাপি’। বাঙালির ছেলে যখন বাবাকে বাপি বলতে শুরু করে তখন শুধু বাবা-ছেলে সম্বন্ধের অন্তর্গত বন্ধনই শিথিল হয়ে যায় না, মাধুর্যটুকুই কেবল লোপ পায় না; খোদ বাংলা ভাষাটাই হারিয়ে যায়। এই সর্বনাশ যে ঘটেছে সেটি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে কলকাতার বাঙালি- যখন তাদের ছেলেমেয়েরা নিজেরই রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সুপার মার্কেটে, মেট্রোরেলে বাংলা বলতে বাধার মুখে পড়ছে, ধুমসে মার খাচ্ছে। ভিন্ন রাজ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গিয়ে হেনস্তা হচ্ছে।
তাহলে এবার আসুন, ড. শাহেদীর বুরদা পরিয়ে দেয়ার মাহাত্ম্য খুঁজে দেখি। শুরু করি কাসিদাতুল বুরদার প্রসঙ্গ দিয়ে। কাসিদাতুল বুরদা মানে চাদরের কবিতা। কবি আল-বুসিরি সুদীর্ঘ কবিতাটি লিখেন ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, মুসলিম বিশ্বে সর্বাধিক পঠিত কবিতা কোনটি বা কার লেখা, তাহলে শেখ সাদী, রুমি, হাফিজ, ফরিদ আত্তার বা ইকবালের কোনো কবিতা নয়, নাম উঠে আসবে আল-বুসিরির এই কাসিদার। হ্যাঁ, ‘কাসিদাতুল বুরদা’ই মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পঠিত কবিতা। বাংলাদেশের বেশির ভাগ পাঠকই, বিশেষ করে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতরা এ খবর রাখেন না। যেমন তারা খবর রাখেন না মুসলিম পণ্ডিতদের অনেক যুগান্তকারী কাজের। আমাদের দুর্ভাগ্য। রাজনীতিকরা ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে আমাদের যোজন যোজন ব্যবধান তৈরি করে দিয়েছেন।
কাসিদা বুরদা সর্বাধিক পঠিত বলা হলেও এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। আমরা ছেলেবেলা থেকে শুনেছি রাসূলের উদ্দেশ্যে নিবেদিত শেখ সাদী রহ:-এর নাত ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি’ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পঠিত। আজকের দিনেও বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে মিলাদ শরিফে পরম ভক্তি ও দরদের সাথে এটি সুর করে পড়া হয়।
যাই হোক, কাসিদাতুল বুরদা নিয়ে চমকপ্রদ কাহিনী প্রচলিত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর প্রশংসায় আরবি ভাষায় রচিত এই সুদীর্ঘ ও জনপ্রিয় কবিতার মূল নাম : ‘আল-কাওয়াকিবুদ দুররিয়্যা ফি মাদিহি খাইল বারিয়্যাহ’ (সেরা সৃষ্টির প্রশংসায় উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজি)। সেরা সৃষ্টি মানে রাসূলুল্লাহ সা:। বলা হয়, আল-বুসিরি যখন পক্ষাঘাতে প্রায় অচল, তখন অসুস্থ অবস্থায় তিনি এই রাসূল প্রশস্তি বা কাসিদা রচনা করেন। পরে এক রাতে তিনি মহানবী সা:-কে স্বপ্নে দেখেন। দেখেন, রাসূল সা: খুশি হয়ে কবিকে বুরদা পরিয়ে দিচ্ছেন। এ ঘটনার পর কবি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তার কবিতাটি ‘কাসিদাতুল বুরদা’ (চাদরের কবিতা) বা ‘বুরদা শরিফ’ বলে খ্যাতি লাভ করে।
শুধু এই অলৌকিকতাই নয়। সরাসরি রাসূল সা:-এর বাস্তব জীবনেও বুরদা সম্প্রদানের ঘটনা ঘটেছিল। আরবের অনেক কবি ইসলাম ও নবীজি সা:-এর চরম বিরোধী ছিলেন। তাদের অন্যতম কবি কা’ব বিন যুহাইর। তিনি মুহাম্মদ সা:-কে নিয়ে অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণ ভাষায় ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপাত্মক কবিতা লিখেন। মক্কা বিজয়ের সময় ইসলামের অনেক শত্রুর মধ্যে কা’ব বিন যুহাইরেরও মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছিল। পরে রাসূল সা: মদিনায় ফিরে এলে কবি কা’ব গোপনে মসজিদে নববীতে হাজির হয়ে রাসূল সা:-এর সাথে দেখা করে ক্ষমা চান। রাসূল সা: তাকে ক্ষমা করেন। কবি তখনই নবীজির প্রশংসায় কবিতা রচনা করেন। কবিতা শুনে মুগ্ধ রাসূলুল্লাহ সা: নিজের গায়ের গিলাফ খুলে কবির গায়ে পরিয়ে দেন। এটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ‘হিরকা-ই সাআদত’ নামে রাসূল সা:-এর সেই চাদর, উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলিফাদের সময় সংরক্ষিত ছিল। এখনো সেটি ইস্তাম্বুলের ‘টপকাপি প্যালেস মিউজিয়ামে’ রাখা আছে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো- কা’ব ইবনে যুহাইরের ‘বানাত সুয়াদ’ বা কাসিদা বুরদা নামের কবিতাই হলো আরবি সাহিত্য তথা ইসলামী সংস্কৃতিতে নবীজির প্রশংসায় রচিত প্রথম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাত বা কাসিদ। কবিতার শুরুটা পড়ুন-
‘সু’আদ আজ দূরে সরে গেছে
আমার হৃদয় তাই বিরহকাতর।
আমি তার প্রেমে বন্দী ও জিঞ্জিরে বাঁধা
কেউ আমার মুক্তিপণ শোধ করেনি।’
রাসূলুল্লাহ সা:-কে নিবেদিত প্রথম কবিতা শুরু হচ্ছে একজন প্রেমিকের নিখাঁদ বিরহযন্ত্রণা তথা প্রেমের আকুতি দিয়ে।
বিরহ কাতরতায় শুরু হলেও, পরে এতে কবির অনুতাপ ও ইসলামের প্রতি আনুগত্যের অনন্য চিত্র ফুটে উঠেছে। এসেছে রাসূল সা:-এর ক্ষমা, মহানুভবতা, উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ও উদারতার প্রশস্তিও। বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই রাসূল হলেন এক অনন্য আলো (নূর), যা থেকে লোকে আলোকিত হয়, তিনি আল্লাহর তরবারিগুলোর মধ্যে এক ধারালো খোলা তলোয়ার।’
ইতিহাস বলছে, কা’বের কবিতা শুনে রাসূল সা: চাদর উপহার দেন। সে জন্য এই কবিতাটিও ‘কাসিদায়ে বুরদাহ’ নামে পরিচিত। কিন্তু প্রায় ৫০০ বছর পর মিসরের কবি আল-বুসিরির লেখা কবিতাই পুরো মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়।
এত কথার অবতারণা এ জন্য যে, কাউকে খুশি হয়ে, বিশেষ করে কবিতা তথা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নন্দিত অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বুরদা বা চাদর পরিয়ে দেয়ার রীতি একান্তভাবেই ইসলামের পুরনো ঐতিহ্য। উত্তরীয় নয়, বুরদারই হওয়া উচিত মুসলিম সমাজে সাংস্কৃতিক সম্মাননার জুতসই প্রতীক।
দেশে সম্মানীত ব্যক্তিদের বুরদা পরিয়ে দেয়ার প্রথম ঘটনা রাজধানী বা কোনো বিভাগীয় শহরে নয়, ঘটে জেলা শহরে। আমাদের সহকর্মী, কবি ও সাংবাদিক রেজাউর রহমান এবং গবেষক প্রাবন্ধিক মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের সংগঠন কিশোরগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ থেকে গুণীজনকে সম্মাননা হিসেবে ‘বুরদা পুরস্কারের’ প্রবর্তন করেন। একাধিক অনুষ্ঠানে তারা গুণীদের বুরদা পরিয়ে দেন। নিঃসন্দেহে তারা বড় কাজ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে চৌদ্দ শ’ বছর আগের এক ঐতিহাসিক ঘটনা জীবন্ত করে তুলেছেন। তাদের দু’জনের নাম ইতিহাসের অংশ হবে।
এখন বায়তুশ শরফের মতো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। প্রতীকী হলেও ইতিহাসের পুনঃনবায়নের সাক্ষী হতে পেরে গর্ব বোধ করেছি। কারণ এটি নিছক কোনো ঘটনা নয়, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এটি হলো মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা, বাঘ, পেঁচা, রাবণের মুখোশ নিয়ে বৈশাখী শোভাযাত্রা, রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে মুসলমানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের মতো সমাজদ্রোহের বিরুদ্ধে সুনিশ্চিত ধর্মীয় ঐতিহ্যচেতনার পুনঃনবায়ন।
রাসূল সা:-এর আদর্শভিত্তিক এই বুরদা পরানোর শৈলী সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠুক। দায়িত্ব একা কারো নয়, আদর্শের জন্য কর্মরত সাংস্কৃতিক সাহিত্যিককর্মী, সংগঠক, পৃষ্ঠপোষক সবার।
রাসূল সা: ছাড়া অনুসরণীয় কে আর আছেন আমাদের সামনে!
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত