রংপুরে এক স্কুলশিক্ষক সপরিবারে খুন হয়েছেন। স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের সবাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। সম্ভাব্য খুনিদের এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে খুনিরা হত্যার কারণ জানিয়েছে। তবে আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতের কোনো একসময় রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। শনিবার রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দরজা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করেন। তারা বাড়ির ছাদে গণপতির লাশ ও সিঁড়িতে তার স্ত্রী-কন্যার লাশ এবং বিছানার নিচ থেকে ছেলের লাশ উদ্ধার করেন। লাশগুলো কেন এভাবে ছড়ানো তার জবাবে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস জানিয়েছে, তাদের আলাদা জায়গায় হত্যা করা হয়েছে। বাড়ির ছাদে মাদক সেবনরত তাদের দেখে ফেলায় প্রথমে গণপতিকে, পরে মা ও মেয়ে এগিয়ে এলে তাদের সিঁড়িতে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী যেন না থাকে সেজন্য পরে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত ছেলেকে একই প্রক্রিয়ায় হত্যা করা হয়। আটক অভিযুক্তরা পরস্পর মামাতো-ফুফাতো ভাই।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা হত্যার কথা স্বীকার করেছে। এর কারণও স্পষ্ট করে জানিয়েছে তারা। একটি সংখ্যালঘু পরিবারের সব সদস্যকে হত্যার ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি পেছনে অন্য কারণ আছে এমন প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে দু’জন খুনি এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে কি না। প্রশ্নগুলো গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। হত্যার শিকার পরিবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় ঘটনার বাড়তি স্পর্শকাতরতা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে হত্যার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার চেয়ে এ নিয়ে রাজনীতির সুযোগ গ্রহণের প্রবণতা থাকে। সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলার চেষ্টা হয়। তাই ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। খুনের সন্দেহাতীত প্রমাণ হাজির করতে হবে।
হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্তকার্যক্রম অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। কোনো পক্ষ যেন দায় এড়ানোর সুযোগ না পায় সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। কোনো ধরনের অস্পষ্টতা থাকা চলবে না। মোট কথা, হত্যার বিচারে যেন কোনো ধরনের গাফিলতি না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে উচ্চহারে খুনের ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য এর কারণ হতে পারে। দখল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য নিশানা করে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এই সুযোগে পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক বিরোধ ও জায়গাজমি দখলের মতো ঘটনায়ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা।
সহযোগী একটি দৈনিকের হিসাবে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দুই হাজার ৭৬টি খুনের মামলা হয়েছে। প্রতি মাসে খুনের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে।
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর সপরিবারে খুন হওয়ার ঘটনা ভিন্ন মাত্রার। এটিকে সাধারণ হত্যার ঘটনা বিবেচনা না করে সরকারের উচিত হবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও বিচারের উদ্যোগ নেয়া।