দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে তরুণরা বিদেশে পাড়ি জমায়। এ জন্য তারা আর্থিক, এমনকি জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নেয়। এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় দেশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় দেখা গেছে, প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতি ধরে রেখেছে। এ দিকে দেশের ক্ষমতার প্রভাবে থাকা লোভী দুর্নীতিবাজ চক্র তাদের ওপর হয় খড়গহস্ত। তারা বিদেশগামীদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলে সিন্ডিকেট। বৈধ ও অবৈধ উপায়ে হাতিয়ে নেয় শত শত কোটি টাকা। রিক্রুটিং এজেন্সির আড়ালে এ চক্র কাজ করলেও তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কখনো কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে দুর্নীতিবাজ একটি চক্র মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। অনিয়ম-দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার কারণে দেশটিতে শ্রমিক পাঠানো নিষিদ্ধ হয়ে যায়। বহুদিন পরে মালয়েশিয়া আবার বাংলাদেশের ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে। তবে এখনো আগের শঙ্কা দূর হয়নি যে, নতুন করে কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠবে না। সরকারের পক্ষ থেকে এই নিশ্চয়তা তৈরি করা প্রয়োজন।

রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা অনুমোদন দেয়ায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ আবারো শুরুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো কিছু দিনের মধ্যে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে। তবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনশক্তি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বা বোয়েসেলের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর সুযোগ থাকল না। তাই আগের সিন্ডিকেট কর্মী প্রেরণে আবারো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ঝুঁকি রয়ে গেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে যখন মালয়েশিয়া কর্মী নেয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তখন এ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ ছিল ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কয়েকজন মাফিয়ার কাছে। একজন কর্মীর জন্য যেখানে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ নির্ধারিত ছিল সেখানে তারা আরো পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা বেশি আদায় করত। এর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরেও দেশটিতে শ্রমিক প্রেরণ বন্ধ হয়ে যায় একই ধরনের সিন্ডিকেটের উৎপাতে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ১৪টি দেশ জনশক্তি রফতানি করে। তার মধ্যে কেবল বাংলাদেশের শ্রমিক যাওয়া বন্ধ হয়। কারণ দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট গড়তে বাংলাদেশীরা এগিয়ে। তারা মালয়েশিয়ার কিছু প্রভাবশালী অসাধু ব্যক্তিকেও সাথে রাখে। জনশক্তি রফতানি ও প্রবাসী আয়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের একেবারে শীর্ষস্থানীয় দেশ। কয়েক বছর বন্ধ থাকলেও দেশটিতে এখন ১৪ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক রয়েছেন। সৌদি আরবের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার এটি। প্রবাসী আয় প্রেরণের দিক থেকে এটি চতুর্থ। দেশটি থেকে বছরে প্রায় ৩৪০ কোটি ডলার প্রবাসী আয় আসে। মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নিরাপদ করা সরকারের অন্যতম কর্তব্য। সে জন্য তাদের কাছে একগুচ্ছ পরিকল্পনা থাকার দরকার ছিল; কিন্তু দেখা গেল, সরকার একটি শ্রেণীর কাছে শ্রমবাজার ইজারা দিয়ে দিলো। আর তারা এটিকে দেখল লুটপাটের একটি মোক্ষম জায়গা।

মালয়েশিয়া সরকার রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদন দিয়েছে। এখন শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী করার কাজ করতে হবে বাংলাদেশকে। এ জন্য বেশি নজর দিতে হবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যেন সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে না পারে।