সম্প্রতি ভারতীয় পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পাল্টা শুল্কারোপ করায় ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি অনেকটা ব্যয়বহুল হয়েছে। নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা চীন থেকেও সরে আসছেন। মার্কিন ক্রেতারা এখন ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকছেন। তাদের ক্রয়াদেশের বড় অংশ যাচ্ছে সে দেশে। তবে ওই দেশে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেখান থেকে মধ্যম দামের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এলে বাংলাদেশে শুধু রফতানি বাড়বে না; বরং সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল তৈরি ও উৎপাদন বৈচিত্র্য আনায় বিদেশী পুঁজি অপরিহার্য।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন ক্রেতাদের বাংলাদেশের প্রতি আস্থা ও আগ্রহ বাড়ছে। ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান থেকেও তৈরী পোশাকের ক্রয়াদেশ আসছে। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানি গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২১ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক বাজারে দ্রুততম প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী সরবরাহকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিকভাবে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। পরিমাণের বিচারে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক আমদানি বেড়েছে ২০ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ইউনিট মূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ১১ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক ক্রেতামহলের নির্ভরযোগ্য উৎসস্থলে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী তৈরী পোশাক ক্রেতারা চীনের বাইরের উৎস অনুসন্ধান করছেন। প্রতিযোগিতামূলক দাম, কমপ্লায়েন্স ও স্থায়িত্বশীলতার মানদণ্ড মেনে চলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় সোর্সিং হাব এখন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক গ্রিন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির দেশ হওয়ায় বৈশ্বিক ক্রেতারা ক্রমে স্থিতিশীল সরবরাহ চেনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বাংলাদেশ সেই চাহিদা পূরণ করছে।
তৈরী পোশাক খাত সূত্র মতে, বাড়তি ক্রয়াদেশ এলেও হুট করে সব গ্রহণ করছেন না দেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা; বরং সক্ষমতার অতিরিক্ত আদেশ না নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক হচ্ছেন তারা। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় অতিরিক্ত ঝুঁকি না নিয়ে ধীরে ধীরে সক্ষমতা বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। এ ক্ষেত্রে গুণগত মান ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের শুল্ক কাঠামো যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। সেই সাথে নতুন কোনো ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটও দেখা দিতে পারে। তাই আমাদের তৈরী পোশাক শিল্পে প্রয়োজন টেকসই প্রবৃদ্ধি।
লক্ষণীয় যে, সম্ভাবনা থাকলেও পোশাক খাতের অনেক উদ্যোক্তা বিদেশী ক্রয়াদেশ নিতে পারছেন না। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করেছে। এতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। রফতানির স্বার্থে সরকারের এ ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি বজায় রাখা দরকার।