দেশে মাত্র এক দিনে বিভিন্ন স্থানে তুচ্ছ ঘটনা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ১৩ জন খুন হয়েছেন। এসব খুনাখুনির ঘটনা এই বার্তাই দেয়, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এখনো সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। তবে আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এমন অবস্থায় পুলিশ বাহিনী পরিস্থিতি কতটা সামাল দিতে পারবে— সে প্রশ্ন আছে। পুলিশ অপারগ হলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি তথা সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে।

শুধু গত সোমবারের কয়েকটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলার অবস্থা স্পষ্ট হয়। এদিন নড়াইলের সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক দুই চেয়ারম্যানের বিরোধে পাঁচজন নিহত হন। রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া খোন্দকারপাড়ায় জমি নিয়ে বিরোধে দু’পক্ষের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন অন্তত ২০ জন। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার বয়রাকান্দি গ্রামে এক কৃষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় মাদক ব্যবসায় নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সাতক্ষীরার কলারোয়ায় পোলট্রি খামার নিয়ে বিরোধে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে সহোদর দুই ভাই হতাহত হন। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বারচান্দুরা গ্রামে স্বামীকে হত্যার পর লাশ ঘরে রেখে পালানোর অভিযোগ উঠেছে স্ত্রীর বিরুদ্ধে। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আশুলিয়ায় প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে দুই পরিবারের বিরোধে এক ব্যক্তি নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন।

অন্য দিকে কত তুচ্ছ ঘটনায় মানুষ আপনজনের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। গত শনিবার লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার করপাড়া ইউনিয়নে বড় ভাইয়ের হাতে প্রবাসী এক যুবকের মৃত্যু হয়। একটি বৈদ্যুতিক মিটার যৌথভাবে ব্যবহার করে আসছিলেন দুই ভাই। বিদ্যুৎ বিলের টাকা দু’জন ভাগাভাগি করে পরিশোধ করতেন। চলতি মাসের বিল পরিশোধের সময় পাঁচ টাকা কম নিয়ে বিরোধে বড় ভাই ছোট ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করেন। এমন নিষ্ঠুরতা নিকট অতীতে হয়েছে কি-না তা আমাদের জানা নেই।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের বাইরেও এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে, যা অজানা থেকে যাচ্ছে। তাই বলা যায়, সারা দেশে সামাজিক অস্থিরতা এখন চরমে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি এই অস্থিরতার দৃশ্যমান ফল।

দেশে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে নানা কারণে। অন্যতম কারণ, স্বার্থপরতা, অসহিষ্ণুতা এবং ছাড় দেয়ার প্রবণতা লোপ পাওয়া। ফলে সমাজে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পারস্পরিক হানাহানি বাড়ছে, যা খুনোখুনির ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষমতার পালাবদলে সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি-গোষ্ঠী স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে।

সারা দেশে এখনো সেনাবাহিনী মোতায়েন আছে। পুলিশও চব্বিশের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে কাজে মনোনিবেশ করেছে। তবে পুলিশের একটি পেশাগত অন্তর্নিহিত শক্তি থাকে, যা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটি এখনো দৃশ্যমান নয় বলে আইনশৃঙ্খলার ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। নতুন সরকারকে আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করতে হবে।