বাংলাদেশের জ্বালানি বিপর্যয়ের আশঙ্কাটি সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কট একসাথে শুরু হওয়ায় মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনে বড় আকারে ব্যাঘাত ঘটছে। সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাটের পরিণতি হিসেবে এ খাতে এমনটি হবে- পূর্বাভাস ছিল। এখন এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সঠিক পথ গ্রহণ করে সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার বদলে দায়িত্বশীল মন্ত্রী আশাহত করার মতো কথা বলে মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎ-গ্যাসের অভাবে মানুষের কষ্টের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এ জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাব আশা জাগানিয়া। একই সাথে এ খাতকে সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন তিনি, সে আশাও মানুষ করেন।

পতিত হাসিনা সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা নিয়ে রীতিমতো ছিনিমিনি খেলেছে। বিদ্যুৎ খাতের চিত্র দেখলে তা সহজে বোঝা যায়। হাসিনা আমলে অবিবেচকের মতো এলোপাতাড়ি যে বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়, তাতে ৩৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা আছে। যেখানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মেগাওয়াট। এ অবস্থায় দেশে লোডশেডিং দুর্ভাগ্যজনক। আবার নির্মিত বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য সরকারকে নিয়মিত খরচ জোগাতে হয়। কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়া শুধু পছন্দের ব্যক্তিদের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সুবিধার্থে গড়ে তোলা হয়েছিল এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ ছাড়া ভারতকেও এ খাত থেকে অন্যায়ভাবে সুবিধা দেয়া হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এর জ্বলন্ত সাক্ষ্য। খরচের সব ভার দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দেয়া হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।

জ্বলানি খাতে হাসিনার চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে দেশকে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বলছেন, চলমান সঙ্কট অবসানে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো সমাধান নেই। গ্রামের লোডশেডিংয়ের ব্যাপারে বলেছেন, লাইন দীর্ঘ হওয়ায় কোথাও ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে সারিয়ে তুলতে বেশি সময় লাগছে। বাস্তবতার সাথে মন্ত্রীর বক্তব্যের মিল নেই। এর মধ্যে এ খাত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এমন সব কোম্পানিকে এতে যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে লুটপাটের নজির আছে। এ কারণে জ্বালানি খাত নিয়ে আবারো লুটপাটের আশঙ্কা অমূলক নয়। নতুন করে কোনো অসৎ কোম্পানিকে যুক্ত না করে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহারের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সুযোগ আছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকায় সবাই দিশেহারা। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য এতে আরো অনাস্থা তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আশা জাগানিয়া হলেও মানুষ কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চায়। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরিতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় তা দেখতে চায়। গ্যাসের মজুদ ও সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, এর টেকসই সমাধানে কাজ করতে হবে। বিদ্যুতের জোগান বাড়াতেও বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ নিতে হবে। এ কাজে এমন ব্যক্তিদের যুক্ত করতে হবে, যারা অভিজ্ঞ-দক্ষ ও একই সাথে দেশপ্রেমিক। পুরনো ক্ষতিকর চুক্তিগুলো কেন এখনো বাতিল হয়নি, স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। সর্বোপরি জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ একটি সৎ কর্তৃপক্ষের অধীনে আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব ব্যাপারে আন্তরিক পদক্ষেপ নেয়ার আশায় আছেন নাগরিকরা।