বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বহুদিন ধরে একটি বড় জাতীয় সমস্যা। আইন ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিলেও বাস্তবতা হলো, দেশের সড়ক এখনো অনিরাপদই রয়ে গেছে। ফলে গণমাধ্যমে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার খবর দেখা যায়। এতে বোঝা যায়, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় আমাদের অগ্রগতি এখনো খুব সীমিত। ২০১৮ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘনায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিয়ে সারা দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দুর্বার কিশোর আন্দোলন গড়ে ওঠে। তবু সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হয়নি।

সড়কে প্রতিনিয়ত কত যে প্রাণ ঝরছে; এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান দেখলে গা শিউরে ওঠে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই দেশে ৪৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৪৭ জন। আহত এক হাজার ১৮১ জন।

গত পরশু বাগেরহাটে ঘটেছে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। ভোরে বিয়ের আনন্দ, বিকেলে বর-কনেসহ ঝরেছে অনেকের প্রাণ। দুর্ঘটনায় গাড়িতে থাকা ১৫ জনের মধ্যে বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন নিহত হয়েছেন। শুধু এই ঘটনা নয়, একই দিন মানিকগঞ্জের শিবালয়ে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী স্বামী-স্ত্রী নিহত হয়েছেন। মাদারীপুরে ট্রাক-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন দু’জন। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রাইভেটকারে ট্রাকের ধাক্কায় যুবদল নেতা নিহত হয়েছেন।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বেপরোয়া ও অসচেতন গাড়ি চালানো। অনেক চালক ট্রাফিক আইন মানেন না। অতিরিক্ত গতি বা ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালান। এর সাথে যুক্ত হয়েছেন অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালানো অথবা সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়া চালকের আসনে বসে পড়েন অনেকে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো- সড়ক অবকাঠামো দুর্বলতা। বহু সড়কে পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড, ফুটপাথ, জেব্রা ক্রসিং বা ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। কোথাও রাস্তা ভাঙাচোরা, কোথাওবা অপ্রতুল আলোর কারণে রাতে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব কারণে পথচারী ও যানবাহন উভয়েই বিপদে পড়ে। আইন প্রয়োগের দুর্বলতাও সড়ক অনিরাপদ থাকার অন্যতম একটি কারণ। যদিও সড়ক পরিবহন আইন রয়েছে; কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ সব সময় দেখা যায় না। অনেক সময় নিয়ম ভাঙলেও শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। এতে আইনভঙ্গকারীরা একই আচরণ বারবার করতে সাহস পান।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমত কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স দেয়া বন্ধ করা, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যান সড়ক থেকে সরিয়ে নিতে হবে। সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড স্থাপন, ফুটপাথ নির্মাণ এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করাও জরুরি। সেই সাথে জনসচেতনতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে চালক, পথচারী ও যাত্রী, সবার ট্রাফিক আইন মেনে চলার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যথাযথ উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।