শিক্ষাবর্ষের শুরুতে নতুন বই শিশুদের কোমল হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। ছাপার অক্ষর আর ছবি নিজের অজান্তেই নবীন ছাত্রদের আকৃষ্ট করে। পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ দারুণ বাড়িয়ে দেয়। দুর্ভাগ্য হচ্ছে- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রদের চাহিদা অনুযায়ী পুস্তক আমরা বছরের শুরুতে সরবরাহ করতে পারি না। তার চেয়ে হতাশার বিষয় হচ্ছে- মানসম্পন্ন বই না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক ছাত্র নতুন বইয়ের আসল স্বাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিগত ১৫ বছর পাঠ্যপুস্তক ছাপানো একটি অসাধু চক্রের হাতে বন্দী ছিল। শিশু-কিশোরদের উন্নতমানের বই দেয়ার চেয়ে ওই চক্রের স্বার্থ সর্বাধিক প্রাধান্য পেত। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরও মানসম্পন্ন বই সরবরাহ সম্ভব হয়নি।

পাঠ্যপুস্তকের জন্য একটি নির্ধারিত মানের কাগজ দরকার হয়। প্রিন্টিং প্রেস ঠিক সেই কাগজ ব্যবহার করছে কি না সেটি আগেই নিশ্চিত করতে হয়। এরপর আছে ছাপার মানের বিষয়টি। ছাপার অক্ষর ও ছবি ঝকঝকে হতে হবে। যাতে কোমল শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট দেখতে পায়। এগুলো যাচাইয়ের জন্য কমিটি আছে, নির্দিষ্ট লোকবল আছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে রয়েছে প্রায় চার কোটি ছাত্র। তাদের জন্য প্রায় ৪০ কোটি বই ছাপানো হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, ছাপানো বইয়ের ২০ শতাংশ নিম্নমানের হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আগের মতোই নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক ছাপানো হবে- এটি মেনে নেয়া যায় না। বছরের শুরুতে এ নিয়ে তদন্ত করে দায়ী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়। প্রাথমিক স্তরে ৪৮টি ও মাধ্যমিক স্তরে ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে মানসম্পন্ন বই প্রতিস্থাপন করার নির্দেশ দেয় এনসিটিবি। এর বাইরেও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বই সরবরাহ করে; কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এনসিটিবির উদ্যোগে ৩২টি দল ৬৪ জেলা থেকে বই সংগ্রহ করে যাচাই করেছে। নিম্নমানের বই সরবরাহের জন্য ৯২টি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। যেখানে মোট ১১৬টি প্রেসে বই ছাপার কাজ পেয়েছিল। অর্থাৎ বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি করেছে।

বিগত সরকারের সাথে জড়িতরা সবকিছুকে লুটপাটের খাত হিসেবে দেখত। তারা পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ হিসেবে দেখেছে। সে জন্য পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ একটি সুস্থ ধারায় বিকশিত হয়নি। এই বিপুল বই মুদ্রণকে কাজে লাগিয়ে দেশের মুদ্রণশিল্পকেও গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। দেখা যেত, আগের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা এ কাজে আগ্রাধিকার দিত প্রতিবেশী দেশের মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে। নতুন সরকার সেই অন্যায্য ব্যবস্থাকে ফেরাতে পেরেছে, সব বই এখন দেশে মুদ্রিত হচ্ছে; কিন্তু দেশের মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগ অসাধুতা করে নিম্নমানের কাগজ ও ছাপা দিচ্ছে। তারাও একে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার বানাচ্ছে। এর সাথে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকেরাও যুক্ত হচ্ছে। এদের সবাইকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অসাধুতা যারা করেছে ভবিষ্যতে তাদের ছাপার কাজ দেয়া যাবে না।

যেকোনো মূল্যে প্রথামিক ও মাধ্যমিকের ছাত্রদের হাতে উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক দিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন বই সরবরাহ করতে পেরেছে, আগামীতে তাদেরই কাজ দিতে হবে।