দেশে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে শিল্পকারখানা। ছাঁটাই হচ্ছেন অসংখ্য শ্রমিক-কর্মচারী। গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে এবং বহু শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। শুধু পোশাক খাতেই বেকার হয়ে পড়েছেন দেড় লাখ শ্রমিক। এর পাশাপাশি হালনাগাদ তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। তৈরী পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন-বিজিএমইএ ও নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন-বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কমপক্ষে ২০ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত কিংবা ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন।
শিল্পের অন্যান্য খাতেও একই অবস্থা। সব খাতের হিসাব নেয়া হলে বন্ধ কারাখানা ও বেকার হওয়া শ্রমিক সংখ্যা অনেক বড় হতে পারে। শুধু পোশাক খাতের যে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে তা-ই রীতিমতো নৈরাশ্যজনক।
একটি সহযোগী দৈনিকের খবরে বলা হয়, গত দুই বছরে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা। কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা। নিশ্চিতভাবেই এটি বিগত স্বৈরাচারী সরকারের অপশাসনের ফল। দীর্ঘ ১৭ বছরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল- আমদানির নামে কমিশনের অর্থে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করা। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এলএনজি আমদানি করেও শিল্পের চাহিদা পূরণ করা যায়নি। এর অনিবার্য ফল শিল্প খাতে উৎপাদন হ্রাস। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন হয়নি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। সারকারখানা বন্ধ হয়েছে বা নামমাত্র উৎপাদন করেছে। এখন সেই সঙ্কটের মারাত্মক কুফল দেখা দিচ্ছে। আরো অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। অদূর ভবিষ্যতে চাকরি হারাতে পারেন আরো বহু শ্রমিক।
জ্বালানি সঙ্কটই শিল্প-কারখানা বন্ধের একমাত্র কারণ নয়। ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, ব্যাংকব্যবস্থার সহায়তা না পাওয়া, সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও শিল্প খাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসহ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপে বিশ্ববাণিজ্যের ওঠানামাও বড় কারণ।
সম্প্রতি দেশে পোশাক খাতে ট্রেড ইউনিয়ন আইন প্রণয়ন এবং বন্ধ কারাখানা চালু করার জন্য প্রণোদনা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনেক মালিক কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের অধিকার দিতে চায় না। তারা ট্রেড ইউনিয়ন আইন এড়িয়ে চলার উদ্দেশে শ্রমিক সংখ্যা সীমিত রাখতে ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নেন। আবার কিছু মালিক প্রণোদনার অর্থ পাওয়ার লোভে কারখানা বন্ধ দেখান বলে অভিযোগ আছে।
এমন পরিস্থিতিতে শিল্প বাঁচানো সরকারের দায়িত্ব। শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ শিল্পের অগ্রগতি মানেই জাতীয় অগ্রগতি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য শিল্পের বিকল্প নেই। শিল্প থেকেই আসে রফতানি পণ্য, যা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সহজ উপায়। শিল্পের মাধ্যমেই সম্ভব কৃষির মতো অন্যতম প্রধান খাতসহ অন্য সব খাতের আধুনিকায়ন। তাই শিল্প খাতের পিছিয়ে পড়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
শিল্প রক্ষায় সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে, এটিই প্রত্যাশিত। সবার আগে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।