জনশক্তি রফতানি শুধু দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতেই সহায়ক নয়, এটি সামাজিক স্থিতির জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছে। সেই সাথে বাড়ছে বেকারত্বের হার। কারণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে বাড়ছে না; বরং পতিত স্বৈরাচারের গত ১৬ বছরের নৈরাজ্যকর শাসনে শিল্প-ব্যবসায়-বাণিজ্যে যে ধস নামে তার জের টানতে হিমশিম খাচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনীতির নানা টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে রফতানি খাতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে তৈরী পোশাক রফতানি বাড়ছে। হয়তো পোশাকশিল্প দুরবস্থা কাটিয়ে উঠবে এবং সেখানে বাড়তি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে; কিন্তু জনশক্তি খাতে বিশেষ কোনো উন্নতি ঘটেনি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়েছে; কিন্তু এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশী শ্রমিক যাওয়ার সংখ্যা কমেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবে শ্রমিকদের সাথে নানা ধরনের প্রতারণা ছাড়াও খুব স্বল্প বেতন দেয়া এবং অনেকসময় বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়ে বলেও অভিযোগ আছে। এসব কারণে মধ্যপ্রাচ্য এখন শ্রমিকদের পছন্দের গন্তব্য থাকছে না।
নয়া দিগন্তের এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপের দেশ ইতালি এবং এশিয়ার উন্নত দেশ জাপানে জনশক্তি রফতানির সুযোগ বাড়ছে। ইতালিতে আগে বাংলাদেশী কর্মীরা যেত অবৈধভাবে। এখন বৈধভাবে যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪৫৪ জন কর্মী ইতালিতে গেছে। শুধু মে মাসে গেছে ১৩৮ জন। এ হার খুবই নগণ্য। এতে সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক জাপান সফরের সময় সে দেশে বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে তা এখনো বাস্তবে রূপ পায়নি। সেখানে প্রতি বছর এক লাখ শ্রমিক পাঠানোর লক্ষ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ‘জাপান সেল’ নামে একটি আলাদা সেল গঠন করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হলে এ খাতে নতুন গতি আসবে। তবে পাঠানোর আগে শ্রমিকদের জাপানি ভাষা ও দক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এটি কিছুটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সেই সাথে আছে দক্ষতা-অদক্ষতার প্রশ্নও। অদক্ষ শ্রমিক পাঠানো কখনোই প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনে না। জাপানে দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে হলে বাড়তি মনোযোগ দেয়ার দরকার হবে।
কিন্তু এরই মধ্যে এমন অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে, শ্রমিকদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। এটি সত্য হলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার যেমন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল জাপানের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটতে পারে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মীদের ওপর নজর রাখার জন্য জোর দেন জনশক্তি রফতানির সাথে জড়িতরা। এসব বিষয় সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যেই পড়ে। আলাদাভাবে তদন্ত করার দরকার পড়ে না।
সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা এবং মন্ত্রণালয় আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে জাপানের শ্রমবাজার বাংলাদেশীদের জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিতে পারে। অনিয়ম দুর্নীতির প্রশ্রয় দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এই সুযোগ নষ্ট হতে দেবে না, জনগণ এমনটিই আশা করে।